মিয়ানমারের মূল্যবান খনিজ সম্পদ দেশটির চলমান গৃহযুদ্ধ ও বিশ্ব অর্থনীতিকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলেছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি) প্রকাশিত ‘দ্য ক্রিটিক্যাল মিনারেলস লিংকিং মিয়ানমারস সিভিল ওয়ার টু দ্য ওয়ার্ল্ড’ শীর্ষক এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। বেসরকারি সংস্থাটি জানিয়েছে, খনিজ সম্পদ মিয়ানমারের সংঘাতের মূল কারণ না হলেও মূল্যবান টিন, সোনা, ‘স্বর্গের পাথর’ খ্যাত জেড এবং ভারী বিরল মৃত্তিকার মতো সম্পদের নিয়ন্ত্রণ দেশটির সামরিক বাহিনী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর অর্থায়ন, অস্ত্র ক্রয় এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে চীন সীমান্তবর্তী ‘মান মাও’ অঞ্চলটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ টিনের খনি। এই এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ করে প্রায় ২০ হাজার সদস্যের সশস্ত্র গোষ্ঠী ইউনাইটেড ওয়া স্টেট আর্মি (ইউডব্লিউএসএ)। ১৯৮৯ সাল থেকে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে তাদের যুদ্ধবিরতি রয়েছে। ২০১০-এর দশকের শেষ ও ২০২০-এর দশকের শুরুর দিকে মিয়ানমার বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম টিন উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হয়, যার সিংহভাগ আসত এই মান মাও থেকে। একপর্যায়ে চীনের আমদানি করা টিন আকরিকের ৯০ শতাংশের বেশি সরবরাহ করত মিয়ানমার, যার বার্ষিক রপ্তানি মূল্য ছিল ১০০ কোটি ডলারের বেশি। তবে ২০২৩ সালের আগস্টে ওয়া কর্তৃপক্ষ খনিটির উৎপাদন প্রায় পুরোপুরি বন্ধ করে দিলে আন্তর্জাতিক বাজারে টিনের দাম ১০ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে টিনের দাম টনপ্রতি ৫৩ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সার্ভার ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশে ব্যবহৃত টিনের এই বিশাল সরবরাহ এমন এক গোষ্ঠীর হাতে রয়েছে, যার ওপর মিয়ানমার সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। চলতি বছরের জুনে চীনের আমদানি করা টিন আকরিকের ৩৭ শতাংশ এসেছে মিয়ানমার থেকে, যা দেশটিকে আবার চীনের একক বৃহত্তম সরবরাহকারীতে পরিণত করেছে।
মিয়ানমারে সংঘাতের আরেকটি বড় উৎস হলো সোনার খনি। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর সাগাইং অঞ্চলের কিছু এলাকায় সোনা উত্তোলনের পরিমাণ ১৬০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারি হিসাবে বছরে মাত্র ৫০০ কেজি সোনা উৎপাদনের কথা বলা হলেও অনানুষ্ঠানিক উৎপাদন এর চেয়ে অন্তত ১০ গুণ বেশি, যার বার্ষিক বাজারমূল্য প্রায় ১০০ কোটি ডলার। এই অর্থ দিয়ে সামরিক সরকারবিরোধী প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো অস্ত্র ও গোলাবারুদ কিনছে। অন্যদিকে, জান্তা সরকারের স্থানীয় কর্মকর্তারাও হামলা না করার বিনিময়ে খনিশ্রমিকদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ ঘুষ ও অনানুষ্ঠানিক কর নিচ্ছেন। প্রতিরোধ যোদ্ধাদের আয়ের উৎস বন্ধ করতে জান্তা বাহিনী সোনার খনি লক্ষ্য করে বিমান হামলাও চালিয়েছে। এই খনি থেকে উত্তোলিত সোনা দেশের ভেতরে কেনাবেচার পাশাপাশি ভারত ও বাংলাদেশে পাচার করা হচ্ছে। তবে এই সোনা তোলার হিড়িক চিন্দুইন নদীর উর্বর চর ও কৃষিজমি ধ্বংস করছে এবং পানি দূষিত করছে।
চীনে ‘স্বর্গের পাথর’ নামে পরিচিত এবং আভিজাত্যের প্রতীক উজ্জ্বল সবুজ ‘ইম্পেরিয়াল জেড’ বা জেডের সবচেয়ে বড় উৎস মিয়ানমারের কাচিন রাজ্যের হপাকান্ত। প্রতিবছর এই খনি থেকে শত শত কোটি ডলারের জেড চীনে পাচার হয়। ২০১৪ সালে এই খাতের মূল্য ছিল প্রায় ৩ হাজার ১০০ কোটি ডলার, যা তৎকালীন মিয়ানমারের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় অর্ধেক। ১৯৯৪ সালে সামরিক বাহিনী ও কাচিন ইনডিপেনডেন্স অর্গানাইজেশনের (কেআইও) মধ্যে যুদ্ধবিরতির পর এখানে বড় আকারের শিল্পভিত্তিক খনন শুরু হয়। ১৯৯০ সাল থেকে তোলা উপগ্রহের চিত্রে এই রূপান্তর দেখা যায়। তবে এই খনির বিস্তৃতির পেছনে রয়েছে পরিবেশগত বিপর্যয়, শ্রমিকদের মাদকাসক্তি ও ভূমিধসে প্রাণহানির মতো বড় মানবিক মূল্য। ২০২৪ সালের মার্চে কেআইও বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালিয়ে হপাকান্তের জেড খনি এবং চীন সীমান্তের বিরল মৃত্তিকার খনিগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয়, যা আগে সরাসরি সামরিক বাহিনীর অধীনে ছিল।
চীনের অর্থনীতি সম্প্রসারিত হওয়ার সঙ্গে ২০০০ ও ২০১০-এর দশকে জেডের চাহিদা ও মুনাফা বাড়ে। তবে সরকারি হিসাবে এই বাণিজ্যের সামান্য অংশই ধরা পড়ে। উন্নত মানের পাথর প্রায়ই সরকারি নিলাম এড়িয়ে অনানুষ্ঠানিক পথে চীনে যায়। ২০১২ সালের শেষ দিক থেকে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু হলে প্রকাশ্যে বিলাসী পণ্য কেনা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এরপর জেডের আয় সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে কমলেও শিল্পটি এখনো বছরে শত শত কোটি ডলারের।
বৈদ্যুতিক গাড়ি, বায়ুবিদ্যুতের টারবাইন এবং উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের জন্য প্রয়োজনীয় ভারী বিরল মৃত্তিকার (বিশেষ করে ডিসপ্রোসিয়াম ও টার্বিয়ামের) অন্যতম প্রধান উৎস মিয়ানমার। ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার সংঘাতের জেরে প্রতিরক্ষা মজুত গড়ে তুলতে এই খনিজের চাহিদা আরও বেড়েছে। পরিবেশগত কারণে চীন নিজের দেশে খনি বন্ধ করার পর ২০১৬ সাল থেকে এই উৎপাদন মিয়ানমারে স্থানান্তরিত হয়। ২০২১ সালে মিয়ানমার থেকে চীনে বিরল মৃত্তিকা রপ্তানির মূল্য দাঁড়িয়েছিল ৭৮ কোটি ডলারে, যা ২০১৪ সালে ছিল মাত্র ১৫ লাখ ডলার। ২০২৪ সালের শেষ দিকে কেআইও এই খনিগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর বেইজিংয়ের সঙ্গে তাদের দর-কষাকষির শক্তি অনেক বেড়ে গেছে। যদিও এই খনিজ উত্তোলনে পাহাড়ের ভেতর বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের ফলে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে এবং মেকং নদীর উপনদী হয়ে এই দূষণ থাইল্যান্ড ও লাওসে ছড়িয়ে পড়ছে।
পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও উন্নত প্রযুক্তির বৈশ্বিক চাহিদাই মূলত মিয়ানমারের প্রত্যন্ত অঞ্চলের খনিগুলোর সম্প্রসারণ ঘটাচ্ছে। এই আন্তর্জাতিক চাহিদা একদিকে যেমন খনি এলাকার পরিবেশ ও কৃষিজমি ধ্বংস করছে, অন্যদিকে খনি থেকে অর্জিত বিপুল অর্থ মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ও তাদের সশস্ত্র প্রতিপক্ষ উভয়কেই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার রসদ জোগাচ্ছে। ফলে স্থানীয় সংঘাত, চীনের শিল্পব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি এখন একই শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে।