গাজায় সংঘটিত গণহত্যায় যুক্তরাজ্যের ভূমিকা ও সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখতে একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জোরালো হচ্ছে। কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের আইন বিভাগের অধ্যাপক এবং ব্রিটিশ একাডেমি অব সোশ্যাল সায়েন্সেসের ফেলো নেভ গর্ডন ২০২৬ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর (14 September 2026) প্রকাশিত এক নিবন্ধে এই দাবি উত্থাপন করেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের সময় তৎকালীন টনি ব্লেয়ার সরকারের বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকাশে এবং তদন্ত কমিটি গঠনে যেমন দীর্ঘ ছয় বছর সময় লেগেছিল, গাজার ক্ষেত্রেও বর্তমান ব্রিটিশ সরকার একই ধরনের গড়িমসি ও সময়ক্ষেপণের পথ বেছে নিয়েছে।
এর আগে, ২০২৫ সালের জুন মাসে তৎকালীন লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন গাজায় গণহত্যার ঘটনায় যুক্তরাজ্যের সংশ্লিষ্টতা তদন্তে একটি স্বাধীন ও উন্মুক্ত বিল পার্লামেন্টে উত্থাপন করেছিলেন। সে সময় অর্ধশতাধিক সংসদ সদস্য এই বিলটির পক্ষে সমর্থন জানালেও তৎকালীন কিয়ের স্টার্মার সরকার এটি আটকে দেয় এবং কোনো তদন্তের প্রয়োজন নেই বলে দাবি করে। সরকারের এই অনীহার মুখে জেরেমি করবিন ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক রাসেল ট্রাইব্যুনালের আদলে একটি স্বাধীন গণ-আদালত বা ট্রাইব্যুনাল গঠন করেন।
পরবর্তীতে ওই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে লন্ডনে এই ট্রাইব্যুনালের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এতে গাজার গণহত্যা থেকে বেঁচে ফেরা সাধারণ মানুষ, গণমাধ্যমকর্মী, চিকিৎসা विशेषज्ञ এবং আন্তর্জাতিক আইনের গবেষকরা সাক্ষ্য দেন। শুনানির মাধ্যমে ইসরাইলি সামরিক অভিযানে ব্রিটিশ সরকারের অস্ত্র সরবরাহ, এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের যন্ত্রাংশ জোগান দেওয়া, রয়্যাল এয়ার ফোর্সের মাধ্যমে নজরদারি ফ্লাইট পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনৈতিকভাবে ইসরাইলকে দায়মুক্তি দেওয়ার মতো অসংখ্য চাঞ্চল্যকর তথ্য ও প্রমাণ সামনে আসে।
ট্রাইব্যুনালের সংগৃহীত এসব তথ্য-প্রমাণ ও প্রতিবেদন গত মার্চ মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেওয়া হয়। সম্প্রতি এই সংক্রান্ত বিলটি পুনরায় ব্রিটিশ পার্লামেন্টে তোলা হলেও বর্তমান সরকার আবারও এর ওপর ভোটাভুটি স্থগিত করেছে। সমালোচকদের মতে, সরকারের এই কৌশল মূলত ইরাক যুদ্ধের তদন্ত এড়ানোর পুরোনো ধারারই পুনরাবৃত্তি মাত্র। তবে ব্রিটিশ জনগণের একটি বড় অংশ এখন ইসরাইলি কর্মকাণ্ডে পশ্চিমা দেশগুলোর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতার বিষয়টি স্পষ্টভাবে অনুধাবন করতে পারছে, যার প্রমাণ মিলছে ফিলিস্তিনের পক্ষে বিশাল জনসমর্থন ও বিভিন্ন জনমত জরিপে।
সম্প্রতি অবৈধ ইসরাইলি বসতি থেকে পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা জারির মতো কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও, তা ব্রিটিশ সরকারের ঐতিহাসিক দায়কে পুরোপুরি মুছে দেয় না। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এখন প্রধানমন্ত্রী বার্নহাম এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড মিলিব্যান্ডের সামনে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে গাজায় ব্রিটিশ ভূমিকার সত্যতা উদঘাটনে একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন তদন্তের পথ বেছে নেওয়ার এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।