চট্টগ্রামে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে কিশোর গ্যাংগুলোর রাজনৈতিক আশ্রয়দাতার পরিবর্তন ঘটেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে যুবলীগ নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় থাকা গ্যাং সদস্যরা এখন বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলছে। এই রাজনৈতিক আশ্রয়ের পরিবর্তনের ফলে নগরে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আরও বেড়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
বাকলিয়ার মো. মুরাদ, যিনি ১৬টি মামলার আসামি, আগে আওয়ামী লীগ আমলে নগর যুবলীগের আহ্বায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন বাচ্চুর আশ্রয়ে ছিলেন। ৫ আগস্টের পর তাকে নগর যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক এমদাদুল হক ওরফে বাদশার সঙ্গে মিছিল-সমাবেশে দেখা যায় এবং ফেসবুকে নিজেকে চান্দগাঁও থানা যুবদলের সংগঠক হিসেবে পরিচয় দেন। তবে যুবদল ও এমদাদুল হক তাকে নিজেদের দলের কেউ নন বলে দাবি করেছেন। মুরাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রবাজি ও মাদক ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে এবং গত রোববার বাকলিয়ায় তার লোকজনের সঙ্গে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম নগরের অন্তত ৪৫টি এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সক্রিয়তা রয়েছে। এর মধ্যে ১১টি গ্যাংয়ের নাম সাম্প্রতিক অপরাধে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে এমবিএস, কেবি, এনএস, ৯৯৯, এক্স-মার্ক, ব্যাকহোল, ডট গ্যাং, বিঙ্গু, পাইথন, সেভেন স্টার ও ফাইভ স্টার। গত মঙ্গলবার খুলশীর পাহাড়তলী ওয়্যারলেস কলোনিতে ‘ফাইভ স্টার’ ও ‘সেভেন স্টার’ গ্যাংয়ের বিরোধে ১৬ বছর বয়সী হৃদয় খুন হয়েছে। সে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বাবার সঙ্গে ফুটপাতে সবজি বিক্রি করত। গত সাড়ে সাত বছরে নগরে কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততায় ৩৯টিসহ মোট ৬৩৫টি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে।
সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী জানিয়েছেন, পুলিশের একার পক্ষে কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। রাজনৈতিক নেতাদেরও কিশোর গ্যাং সদস্যদের কাছে ভিড়তে দেওয়া উচিত নয়। ২০১৮ সালে স্কুলছাত্র আদনান ইসফার হত্যার পর পুলিশ ৪৮ জন পৃষ্ঠপোষকের তালিকা করেছিল, যা ২০২৪ সালের মার্চে আরও ১৬ জন বেড়ে ৬৪ জনে দাঁড়িয়েছিল। পুলিশের ধারণা, বর্তমানে গ্যাং ও সদস্য সংখ্যা আগের চেয়ে বেড়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অনেক পুরনো পৃষ্ঠপোষক গা ঢাকা দিলেও গ্যাং সদস্যরা এলাকাতেই থেকে গেছে এবং নতুন রাজনৈতিক মিত্র খুঁজছে।
নগর বিএনপির সদস্যসচিব নাজিমুর রহমান স্বীকার করেছেন যে, কিছু গ্যাং সদস্য এখন দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে ভিড়ছে, যা দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। তিনি জানান, যারা তাদের আশ্রয় দিচ্ছে, তাদের সতর্ক করা হচ্ছে। এছাড়া ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগা নামের আরেক আলোচিত ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে, যিনি ২৩ মামলার আসামি এবং গত ৮ জুন নগর স্বেচ্ছাসেবক দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। পাহাড়তলী এলাকায় তার গ্যাংয়ের ভয়ে সাধারণ মানুষ মুখ খুলতে সাহস পায় না বলে স্থানীয় শিক্ষকরা জানিয়েছেন। ওয়াকিল পলাতক থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি, তবে তার ভাই রকি হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে মাদক ব্যবসার গভীর যোগসূত্র তৈরি হয়েছে। মাদক বিক্রির স্থান নিয়ন্ত্রণ, প্রতিপক্ষকে হটানো, স্থানীয় বাসিন্দাদের ভয় দেখানো এবং পুলিশের অভিযানে বাধা দিতে কিশোরদের ব্যবহার করা হচ্ছে। গত আট মাসে পুলিশের ওপর এ ধরনের পাঁচটি হামলার ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে চট্টগ্রামে কিশোর অপরাধের ১ হাজার ৬২৩টি মামলা বিচারাধীন থাকলেও সাক্ষী হাজির না হওয়ায় বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিচ্ছে। সুজন চট্টগ্রামের সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, শুধুমাত্র সদস্যদের গ্রেপ্তার করে সমস্যার সমাধান হবে না, বরং পৃষ্ঠপোষক ‘বড় ভাইদের’ আইনের আওতায় আনতে হবে। তা না হলে ‘বড় ভাই’ বদলাবে, কিন্তু কিশোর গ্যাং থেকে যাবে।
২০২৪ সালের মার্চে ওই তালিকায় আরও ১৬ জনের নাম যুক্ত হয়।পুলিশের হিসাবে, এসব পৃষ্ঠপোষকের আশ্রয়ে প্রায় ২০০ কিশোর গ্যাংয়ে অন্তত ১ হাজার ৪০০ সদস্য সক্রিয় ছিল।