চট্টগ্রামের চান্দগাঁওয়ের একটি পোশাক কারখানায় কর্মরত মোহাম্মদ মহিউদ্দিন (ছদ্মনাম) গত আট বছর ধরে সিনিয়র অপারেটর হিসেবে কাজ করছেন। প্রতিদিন আট থেকে নয় ঘণ্টার বেশি সময় তাকে কারখানার ভেতরে মেশিনের সামনে কাটাতে হয়। মহিউদ্দিন জানান, কারখানার ভেতরে সরাসরি রোদ না থাকলেও মেশিনের তাপ এবং বায়ু চলাচলের সীমাবদ্ধতার কারণে বাইরের চেয়ে ভেতরে গরম অনেক বেশি অনুভূত হয়। কাজের চাপে তৃষ্ণা পেলেও পর্যাপ্ত পানি পান করা তার পক্ষে সম্ভব হয় না। কারণ, পানি বেশি পান করলে বারবার টয়লেটে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে, আর উৎপাদন লাইনে কাজ রেখে বারবার টয়লেটে যাওয়ার সুযোগ সব সময় থাকে না। এছাড়া কর্মস্থলের পাশে পানি রাখার ব্যবস্থাও নেই, যার ফলে তৃষ্ণা চেপে রেখেই কাজ চালিয়ে যেতে হয় তাকে।
একই ধরনের পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন পোশাকশ্রমিক শিরিনা বেগম। তিনি জানান, প্রচণ্ড গরমে তৃষ্ণা বাড়লেও পানি খাওয়ার জায়গা অনেক দূরে হওয়ায় কাজ বন্ধ করে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। বেশি পানি পান করলে টয়লেট ব্যবহারের প্রয়োজন বাড়ে, যা কাজের গতি কমিয়ে দেয়। কাজের মাঝখানে বারবার টয়লেটে গেলে ঊর্ধ্বতনরা কাজ জমে যাওয়ার কথা বলে চাপ সৃষ্টি করেন। এছাড়া নিয়ম অনুযায়ী কাজের ফাঁকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম বা বিরতিও সব সময় পাওয়া যায় না, যার ফলে কাজের চাপের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পানি পানের অভ্যাস করতে হয়েছে তাকে।
এই শ্রমিকদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্প্রতি দেশের পোশাক কারখানাগুলোর শ্রমিকদের ওপর করা গবেষণার ফলাফলের মিল পাওয়া গেছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইআইইডি) ও ওকাপের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, গরমের মৌসুমে বাংলাদেশের ৬৬ শতাংশ পোশাকশ্রমিক অতিরিক্ত তাপজনিত অসুস্থতার দ্বিতীয় স্তর ‘হিট ইগজোশনে’ আক্রান্ত হন। দেশের আটটি কারখানায় ছয় মাস ধরে তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ করে এই গবেষণা চালানো হয়েছে।
গবেষকদের তথ্যমতে, অতিরিক্ত ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে লবণ ও পানি বেরিয়ে গেলেও তা পূরণের পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় শ্রমিকরা অসুস্থ হয়ে পড়েন। গবেষণায় উঠে এসেছে, প্রতি সাত পোশাক শ্রমিকের মধ্যে একজন এমন পর্যায়ে পৌঁছান যা হিটস্ট্রোকের মতো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার দিকে নিয়ে যেতে পারে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, হিট ইগজোশনে আক্রান্ত প্রতি ২০ শ্রমিকের মধ্যে ১৯ জনই কোনো ধরনের চিকিৎসাসেবা পান না। গরমের সময় শ্রমিকদের মধ্যে অতিরিক্ত ঘাম, মাথা ঘোরা, মাথাব্যথা এবং বমি বমি ভাবের মতো উপসর্গ নিয়মিত দেখা যাচ্ছে বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।