ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধ অবসানের জন্য তেহরানকে তাদের পরমাণু জ্বালানি সমৃদ্ধকরণের সক্ষমতা ‘দৃশ্যমানভাবে’ কমিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ভবিষ্যতে সক্ষমতা কমানোর মৌখিক আশ্বাস বা প্রতিশ্রুতি এখন আর যথেষ্ট নয়; বরং ইরানকে এ বিষয়ে বাস্তব ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে।
আলাস্কায় নির্বাচনী প্রচারণা শেষ করে সোমবার রয়টার্সের মুখোমুখি হন ভ্যান্স। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ইরান যদি সত্যিই পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে না চায়, তবে তাদের ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদনের কোনো প্রয়োজন নেই। তিনি বলেন, পরমাণু অস্ত্র না বানানোর সদিচ্ছা দেখাতে হলে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ জ্বালানি তৈরি বন্ধ করতে হবে। কথার বদলে কেবল সুনির্দিষ্ট ও অর্থবহ পদক্ষেপের বিপরীতেই যুক্তরাষ্ট্র পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
সম্প্রতি যুদ্ধ বন্ধ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান রুট হরমুজ প্রণালি সচল করার লক্ষ্যে ওয়াশিংটন ও তেহরান একে অপরকে বিভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছে। তবে ইরানের দেওয়া সর্বশেষ প্রস্তাবটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রত্যাখ্যান করেছেন। এমনকি আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর সামরিক অভিযান আরও জোরালো হতে পারে বলেও ট্রাম্প সতর্ক করেছেন। এই শান্তি আলোচনার আরেকটি বড় অন্তরায় হিসেবে ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার অস্পষ্টতাকে দায়ী করেছেন ভ্যান্স।
ভ্যান্স জানান, ওয়াশিংটন বর্তমানে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে ইরানের বর্তমান শাসন কাঠামোয় তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ঠিক কতটুকু, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিশেষ করে যুদ্ধের শুরুতে মার্কিন ও ইসরায়েলি যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর এই uncertainty বা অনিশ্চয়তা আরও ঘনীভূত হয়েছে। মঙ্গলবার ট্রাম্পও একই সুরে বলেন, ইরানে আসলে কে দেশ পরিচালনা করছে, তা কেউ নিশ্চিতভাবে জানে না।
অবশ্য মার্কিন প্রশাসনের এমন দাবিকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া কীভাবে কাজ করে তা মার্কিন কর্মকর্তারা খুব ভালো করেই জানেন। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের নিজেদের মধ্যকার পরস্পরবিরোধী অবস্থান ও অস্পষ্ট বার্তাই এই সংকটের মূল কারণ।
এদিকে যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে মার্কিন সামরিক কমান্ডারদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলেছেন ভ্যান্স। তিনি দাবি করেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরানি বাহিনী মাঝে মাঝে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালালেও, এই জলপথ দিয়ে জ্বালানি রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ করার মতো সক্ষমতা তাদের নেই। হোয়াইট হাউসের শীর্ষ আলোচক হিসেবে পরিচিতি থাকলেও শান্তি আলোচনায় নিজের সরাসরি নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি ভ্যান্স। তবে তিনি উল্লেখ করেন, শেষ পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্টই সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
টানা সাত মাস ধরে চলা এই যুদ্ধ বিশ্ব জ্বালানি বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি করেছে। যুদ্ধের পেছনে প্রতি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে, যা ট্রাম্প ও তার দল রিপাবলিকানদের জন্য বড় রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঙ্গরাজ্যগুলোতে রিপাবলিকান প্রার্থীদের কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। আলাস্কায় রিপাবলিকান সিনেটর ড্যান সুলিভানের পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিয়ে ভ্যান্স ভোটারদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন এবং ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনার সমালোচনা এড়িয়ে রিপাবলিকানদের পাশে থাকার আহ্বান জানান। ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মেরি পেলটোলার বিরুদ্ধে সেখানে কঠিন লড়াই করছেন সুলিভান। এছাড়া ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নিজের প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে জানতে চাওয়া হলে ভ্যান্স জানান, এ বিষয়ে তিনি এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি।