প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ১৬ হাজার ২০৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ে মোট ১৩টি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বুধবার (৭ অক্টোবর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে একনেক চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়। অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে ১০টি একদম নতুন, দুটি সংশোধিত এবং একটির মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে।
এসব প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে জোগান দেওয়া হবে ১০ হাজার কলোটি ৮০ লাখ টাকা। এছাড়া প্রকল্প ঋণ হিসেবে ৪ হাজার ৮১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে ১ হাজার ৫২৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে। সভা শেষে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি।
অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম বড় উদ্যোগ হলো বাগেরহাটের রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াট পিক (এমডব্লিউপি) ক্ষমতাসম্পন্ন সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ। ২ হাজার ৪৯৮ কোটি ৮ লাখ টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি করা, দেশের প্রাথমিক জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করা। পরিকল্পনা কমিশন ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৯ সালের মার্চ মাসের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে।
রামপাল সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের অর্থায়নে বিপিডিবির নিজস্ব তহবিল থেকে ৩৭৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা এবং পাওয়ার সেক্টর ডেভেলপমেন্ট ফান্ড থেকে ঋণ হিসেবে ২ হাজার ১২৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা দেওয়া হবে। এই ঋণের সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে ২ শতাংশ, যা এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ মোট ১৬ বছরে পরিশোধ করতে হবে। পরিকল্পনা কমিশনের একজন কর্মকর্তা জানান, এই প্রকল্পটি ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় ভূমিকা রাখবে।
প্রস্তাবিত এই সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি রামপালের ব্লক-বি এলাকায় বিপিডিবির নিজস্ব ৯১৮ দশমিক ৫০ একর জমিতে নির্মিত হবে। নিজস্ব জমি ব্যবহারের ফলে নতুন করে কোনো জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না, যা প্রকল্প ব্যয় কমাতে সাহায্য করবে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ রামপালের নিকটবর্তী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যমান সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা হবে। এর আগে ২০১২ সালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য বিপিডিবি মোট ১ হাজার ৮৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ করেছিল, যা ব্লক-এ (৯১৫.৫০ একর) এবং ব্লক-বি (৯১৮.৫০ একর) নামে দুটি ভাগে বিভক্ত। ব্লক-এতে মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মিত হয়েছে এবং ব্লক-বিতে ইতোমধ্যে ভূমি উন্নয়ন ও সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে।
একনেক সভায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সাতটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের নতুন পাঁচটি অঞ্চলের ১৮টি ওয়ার্ডের সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, রংপুর সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন ও ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা পুনর্বাসন এবং গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ১ থেকে ৮ নম্বর জোনে রাস্তা, নর্দমা ও ফুটপাত নির্মাণ প্রকল্প। এছাড়া সমবায়ের মাধ্যমে নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা সৃষ্টি, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও নওগাঁ জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং গুরুত্বপূর্ণ নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের দ্বিতীয় সংশোধনী অনুমোদন পেয়েছে।
অন্যান্য প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিআইডব্লিউটিসির জন্য ৩৫টি বাণিজ্যিক ও ৮টি সহায়ক জলযান সংগ্রহ এবং দুটি নতুন স্লিপওয়ে নির্মাণ প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধনী। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ রেলওয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রকল্পের আওতায় ৩০টি মিটারগেজ ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সংগ্রহের প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে ফ্রান্সের প্যারিসে কেনা চ্যান্সারি ভবন সংস্কার ও আধুনিকায়ন প্রকল্পটিও অনুমোদন পেয়েছে। এছাড়া সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীনে পঞ্চগড়ের ভজনপুর-আটোরখাড়ি-আমতলী-মিরগড় সড়কে দ্বিতীয় করতোয়া সেতু নির্মাণ এবং থানচি-রিমাকরি-মদক-লিকরি সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী অনুমোদিত হয়েছে। সভায় পরিকল্পনা মন্ত্রী কর্তৃক ইতোমধ্যে অনুমোদিত জয়পুরহাট জেলার নন্দাহার, হারাবতী নদী, নুনগোলা ও খাড়োয়া খাল পুনঃখনন প্রকল্প সম্পর্কে একনেককে অবহিত করা হয়।
উক্ত সভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এবং পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকিসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দু’টি প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে— ভজনপুর (নিজবাড়ী)-আটোরখাড়ি-ময়নাগুড়ি-আমতলী-মিরগড়-পঞ্চগড় (জেড-৫০৬০) সড়কের ১৫তম কিলোমিটারে দ্বিতীয় করতোয়া সেতু নির্মাণ এবং থানচি-রিমাকরি-মদক-লিকরি সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী।