দেশের এলপিজি বাজারে সিন্ডিকেটের কারসাজি ভাঙতে সরকারের নানা নির্দেশনা থাকলেও গত সাত মাসে এক কেজি এলপিজিও আমদানি করতে পারেনি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। পাঁচ দফা আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেও সরবরাহকারী না পাওয়া এবং সরাসরি ক্রয়নীতির আওতায় কাজ পাওয়া প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতায় সরকারি আমদানির উদ্যোগ থমকে রয়েছে। এর সুযোগ নিয়ে বেসরকারি খাতের শক্তিশালী সিন্ডিকেট বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে এবং সাধারণ মানুষকে চড়া দামে এলপিজি কিনতে হচ্ছে।
বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্দেশ দেওয়া সত্ত্বেও বিপিসির অদক্ষতায় সাত মাস ধরে আমদানির প্রক্রিয়া ঝুলে আছে। আন্তর্জাতিক বাজারে যখন প্রতি টন এলপিজির জাহাজ ভাড়া বা ফ্রেইড চার্জ ছিল ২০০ ডলারের কম, তখন দরপত্রে অংশ নেওয়া সরবরাহকারীরা অতিরিক্ত ভাড়া হিসেবে ২৭০ ডলার দাবি করে। এ কারণে বিপিসি সরবরাহকারী চূড়ান্ত করতে পারেনি। সম্প্রতি নিয়োগপ্রাপ্ত বিপিসির চেয়ারম্যান ড. রফিকুল ইসলাম এ বিষয়ে জানান, অস্বাভাবিক প্রিমিয়াম দাবির কারণে পাঁচবার টেন্ডার ডেকেও কোনো কোম্পানিকে এলপিজি সরবরাহের কাজ দেওয়া যায়নি। বর্তমানে বড় বড় সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমদানির চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তবে একজন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এটিকে ‘পরিকল্পিত ব্যর্থতা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
এদিকে গত ৭ অক্টোবর সরাসরি ক্রয়নীতির (ডিপিএম) আওতায় স্পিড মার্কেটিং করপোরেশন নামের একটি অখ্যাত কোম্পানিকে ৫ হাজার টন এলপিজি সরবরাহের কাজ দেয় বিপিসি। কোম্পানিটি প্রতি টন মাত্র ৯৭ ডলার ফ্রেইড চার্জে সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছিল এবং গত ২ সেপ্টেম্বর ২ কোটি টাকার পারফরম্যান্স গ্যারান্টিও জমা দেয়। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রকৃত ভাড়া ১৫০ ডলারের বেশি হওয়া সত্ত্বেও কেন বিপিসি এই অস্বাভাবিক কম দামের প্রস্তাব গ্রহণ করে সময়ক্ষেপণ করল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। চুক্তি হওয়ার পরও এখন পর্যন্ত এই কোম্পানির মাধ্যমে কোনো এলপিজি দেশে আসেনি।
সরকারি আমদানির এই স্থবিরতার কারণে দেশের ১৭-১৮ লাখ টনের বার্ষিক এলপিজি চাহিদার ৯৮ দশমিক caves৬৭ শতাংশই বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যেখানে সরকারি খাতের অবদান মাত্র ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জানান, বিপিসি দ্রুত এলপিজি আমদানি করতে পারলে বেসরকারি খাতের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কমবে এবং জনগণ উপকৃত হবে। বর্তমানে ওমেরা পেট্রোলিয়াম, পেট্রোমেক্স, মেঘনা এবং যমুনা স্পেসটেক—এই চারটি কোম্পানিই বাজারের ৬৮ শতাংশ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে। এছাড়া বিএম এনার্জি ৮ শতাংশ, ইউনাইটেড আইগ্যাজ ৭ শতাংশ, ডেল্টা ৪ শতাংশ এবং জেএমআই ও প্রিমিয়াম এলপিজি ৩ শতাংশ বাজার ধরে রেখেছে।
বাজারে এলপিজির পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও গত মাসের শেষে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বিইআরসি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। দেশে ২৯টি এলপিজি কোম্পানি চালু থাকলেও গত সেপ্টেম্বর মাসে মাত্র ১০টি কোম্পানি এলপিজি আমদানি করেছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ২৩ হাজার ৫০০ টন আমদানি করেছে ইউনাইটেড আইগ্যাজ, যা আগস্টে ছিল ১২ হাজার টন। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২১ হাজার টন আমদানি করেছে যমুনা স্পেসটেক। এছাড়া বিএম এনার্জি ১৮ হাজার ২৫২ টন, ওমেরা ১৪ হাজার ৫০০ টন এবং মেঘনা গ্রুপ ১৩ হাজার ৪০০ টন আমদানি করেছে। আগস্টে মোট ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টন এবং সেপ্টেম্বরেও দেড় লাখ টনের বেশি এলপিজি আমদানি করা হয়েছে।
সরকারিভাবে এলপিজি মজুত ও সরবরাহ বাড়াতে মোংলায় ৮ হাজার ২০০ টন ধারণক্ষমতার ট্যাংক, টাঙ্গাইলের এলেঙ্গার কালিহাতী ও রাজাবাড়িতে মজুত ও বটলিং প্ল্যান্ট এবং দক্ষিণ কাট্টলীতে ২৬ দশমিক ১১৯ একর জমিতে ট্যাংক ও বটলিং প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে এসব প্রকল্পের কাজ এখনো পুরোপুরি শুরু হয়নি। এছাড়া মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের জেটি ব্যবহার করে বড় জাহাজ থেকে এলপিজি আমদানির বিষয়ে মার্কিন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের সভাপতিত্বে বৈঠক ও একটি কমিটি গঠন করা হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিপিসি ১ সেপ্টেম্বর আইআইএফসি-এর সঙ্গে চুক্তি করেছে, যারা সিঙ্গাপুরের ডিএসবিকে দিয়ে জেটি ব্যবহারের সক্ষমতা সমীক্ষা করাবে। ছোট জাহাজে এলপিজি এনে বেসরকারি কোম্পানির কাছে বিক্রির জন্য জেএমআই এলপিজির সঙ্গে চুক্তি হলেও মূল্য পরিশোধের পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক চলছে। এর আগে গত ৯ জুলাইয়ের মন্ত্রিসভা বৈঠকে দেশের দরিদ্র পরিবারগুলোকে ভর্তুকি মূল্যে এলপিজি সরবরাহের নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী।