স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা এবং প্রচলিত আইন-নীতি তোয়াক্কাই করছে না পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর। কেনাকাটায় স্বচ্ছতা ও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করাসহ অধিদপ্তরকে যুগোপযোগী করার তাগিদ দেওয়া হলেও তা আমলে নিচ্ছে না প্রতিষ্ঠানটি। এ নিয়ে মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যমান আইন উপেক্ষা করে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর সম্প্রতি মাতৃত্বকালীন ও মাতৃত্ব-পরবর্তী প্রায় ২৫ ধরনের জরুরি ওষুধ (ডিডিএস কিট) ক্রয়ে ১৭৫ কোটি টাকার দরপত্র আহ্বান করেছে। মোট পাঁচটি প্যাকেজে এই দরপত্র ভাগ করা হয়, যার প্রতিটির মূল্য ৩৫ কোটি টাকা। কিন্তু প্রতিটি প্যাকেজের দরপত্রে অংশ নেওয়ার জন্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অন্তত ২১ কোটি ১২ লাখ টাকার পূর্ব অভিজ্ঞতার কঠিন শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এতে আওয়ামী লীগ আমলের সুবিধাপ্রাপ্ত নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটই ঘুরেফিরে এসব কাজ পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে এবং বঞ্চিত ও নবীন ঠিকাদারদের অংশগ্রহণের পথ বন্ধ হয়ে গেছে।
স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, দরপত্রে এমন শর্তারোপ ২০২৬ সালে সংশোধিত পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। আইনের ২৫ নম্বর ধারার ২ নম্বর উপধারা অনুযায়ী, নতুন নিবন্ধিত বা নবীন উদ্যোক্তাদের সুযোগ সীমিত করে এমন কোনো অপ্রয়োজনীয় শর্ত চাপানো যাবে না। একই ধারার ৩ নম্বর উপধারায় দীর্ঘমেয়াদি অভিজ্ঞতা, উচ্চ টার্নওভার কিংবা একক বৃহৎ চুক্তির অভিজ্ঞতাকে বাধ্যতামূলক শর্ত করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া আইনের ২৬(২) ধারায় ক্ষুদ্র, নারী ও বঞ্চিত দরপত্রদাতাদের অংশ নেওয়ার সুবিধার্থে শর্ত শিথিলের বিধান থাকলেও অধিদপ্তর উল্টো শর্ত আরও কঠিন করেছে।
দরপত্রে এমন অনিয়মের বিষয়টি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেনের নজরে আনা হলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেন। তিনি স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিব বেনজামিন রিয়াজীকে নির্দেশ দেন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ড. জিন্নাত রেহানাকে ৫০ শতাংশ শর্ত শিথিল করে সংশোধনী নোটিশ জারির বার্তা দিতে। তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সেই নির্দেশনা দেওয়ার দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেয়নি।
মন্ত্রণালয়ের আদেশ তোয়াক্কা না করা ও অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ড. জিন্নাত রেহানা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার বিগত সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের বড় অঙ্কের বরাদ্দ লুটপাট হয়েছে। অন্যান্য বিভাগে সিন্ডিকেট ভাঙার উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পুরোনো সিন্ডিকেট এখনও সক্রিয়। ফলে ১৯৭৬ সালের জনসংখ্যা নীতির আওতায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী পৌঁছানো ও সচেতনতা বাড়ানোর যে কর্মসূচি শুরু হয়েছিল, তা বর্তমানে স্থবির হয়ে পড়েছে। বর্তমান সরকার এটি পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করলেও অধিদপ্তরের অসহযোগিতায় তা এগোচ্ছে না।
এদিকে সরকারি কাজের স্বচ্ছতা আনতে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬-এর অধীন প্রয়োজনীয় বিধিমালা ও নতুন রেট শিডিউল প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত সরকারি সব ধরনের দরপত্র ও ক্রয় প্রক্রিয়া স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন-১ শাখা থেকে পরিপত্র জারি করে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে জরুরি রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে এ নিয়ম প্রযোজ্য হবে না।
প্রকাশ : ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৫: ৪৯আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৫: ৫২
আওয়ামী লীগ সমর্থিত ঠিকাদারদের সুযোগ করে দিতেই আইন ভেঙে কঠিন শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি তালিকাভুক্ত কয়েকজন ঠিকাদারের। তারা বলেন, গত ১৭ বছর হাতেগোনা যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান একচেটিয়ে কাজ করে শত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন, তারাই এখন কাজ পাবেন। অন্যদের আর কোনো সুযোগ থাকছে না।