ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বামপন্থী নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা চতুর্থবারের মতো ঐতিহাসিক জয়লাভ করেছেন। রোববার দেশটির নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে তার এই বিজয় ঘোষণা করে। জনমত জরিপ, অতীতের নির্বাচনী নজির এবং বিশ্বজুড়ে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে জনমতের প্রবল স্রোত উপেক্ষা করে লুলার এই জয়কে লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে ডানপন্থীদের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, নির্বাচনে তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর জ্যেষ্ঠ ছেলে ও সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারোকে পরাজিত করেছেন। প্রথম দফায় এগিয়ে থাকলেও রান-অফে ফ্লাভিও ৪০ লাখেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে পিছিয়ে পড়েন।
নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ফ্লাভিও বলসোনারো। তিনি সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ভোটগ্রহণের সময় দুই ঘণ্টা বাড়ানোর বিষয়টিকে পুঁজি করে ফল বাতিলের আবেদনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ২০২২ সালের নির্বাচনে জইর বলসোনারোর মতোই তার ছেলে এখন একই ধরনের অবস্থান নিয়েছেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ফ্লাভিও তার বাবার চেয়েও দ্বিগুণ ব্যবধানে পরাজিত হওয়ায় এই ফল বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। রেনের লাতিন আমেরিকা বিষয়ক বিশ্লেষক মারিও ব্রাগা মনে করেন, আগামী কয়েক দিনে ডানপন্থীদের বিক্ষোভের সম্ভাবনা থাকলেও নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল পরিবর্তনের সুযোগ নেই বললেই চলে।
৮০ বছর বয়সী লুলা ২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। দুর্নীতির দায়ে ২০১৮ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত কারাবাস এবং পরবর্তী সময়ে দণ্ডাদেশ বাতিল হওয়ার পর এটি তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি বড় প্রত্যাবর্তন। বৈশ্বিক বামপন্থী রাজনীতির প্রভাবশালী এই নেতাকে ব্রাজিলের রাজনীতিতে এক মহীরুহ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন আইনপ্রণেতা এরিকা হিলটন। তবে এবারের জয়টি সহজ ছিল না। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, দুর্নীতির কেলেঙ্কারি এবং অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত মানুষের চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাওয়ার অভিযোগে তিনি ও তার ওয়ার্কার্স পার্টির জনপ্রিয়তা কিছুটা কমেছিল।
নির্বাচন বিশ্লেষক লিওনার্দো বারেতোর মতে, ভোটাররা নতুনত্বের চেয়ে লুলার পরিচিত রাজনৈতিক পথকেই বেছে নিয়েছেন। প্রচারাভিযানে লুলা তার পূর্বের মেয়াদে বেকারত্ব, নিরক্ষরতা ও বন উজাড়ের হার কমানোর সাফল্য তুলে ধরেন। তিনি সতর্ক করেছিলেন যে, ফ্লাভিও বলসোনারো ক্ষমতায় এলে সামাজিক সুরক্ষা ব্যয় কমতে পারে এবং ব্রাজিলের সার্বভৌমত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। লুলার এই জয়কে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য একটি রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবেও দেখা হচ্ছে, কারণ এর ফলে লাতিন আমেরিকায় ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা ও অভিবাসন নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ডানপন্থী জোটের প্রভাব হ্রাস পাবে।
ঐতিহাসিক বিজয় সত্ত্বেও লুলার চতুর্থ মেয়াদ বেশ চ্যালেঞ্জিং হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ১৯৮০-এর দশকে গণতন্ত্রে ফেরার পর এবারই সবচেয়ে রক্ষণশীল কংগ্রেস নির্বাচিত হয়েছে ব্রাজিলে। ফ্লাভিও বলসোনারোর লিবারেল পার্টি ও তাদের মিত্ররা নিম্নকক্ষে ২৮০টির বেশি আসন এবং সিনেটে প্রায় ৫০টি আসন নিয়ন্ত্রণ করছে। এতে বাজেট প্রণয়ন ও গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সীমিত হতে পারে। এছাড়া আগামী বছর ব্রাজিলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৩ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকার পূর্বাভাস রয়েছে এবং সরকারি ঋণ জিডিপির ৮২ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এই প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে লুলাকে শক্তিশালী বিরোধী কংগ্রেস ও জনগণের প্রত্যাশার ভারসাম্য বজায় রেখে দেশ পরিচালনা করতে হবে।