বাংলাদেশের শহরগুলোতে যানজট, জলাবদ্ধতা, বায়ুদূষণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও আবাসনসংকটের মতো নাগরিক সমস্যা সমাধানের চেষ্টা ক্রমাগত হলেও সংকট থেকে বের হওয়া সম্ভব হচ্ছে না। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব শেফিল্ডের শিক্ষক ও নগর-গবেষক তানজিল শফিক মনে করেন, এই নগর সংকটের মূল গভীরে রয়েছে নগর-কল্পনার এক গভীর সংকট। আমরা কেমন শহর চাই এবং সেই শহর কার জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে—এসব মৌলিক প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণে আমাদের সম্মিলিত ভাবনার সীমাবদ্ধতাই সমস্যাগুলোকে প্রতিনিয়ত নতুন রূপ দিচ্ছে।
বাংলা অঞ্চলের বসতি ও নগরায়ণের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই ভূখণ্ডের বিকাশ রোমের মতো কোনো একক ও কেন্দ্রীভূত নগরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেনি। নদীমাতৃক এই অঞ্চলে মানুষের বসতি ও অর্থনৈতিক জীবন ছিল মূলত নদী, খাল, বিল ও জলাভূমির ওপর নিবিড়ভাবে নির্ভরশীল। মোগল আমলে প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে ঢাকার বিকাশ ইউরোপীয় কোনো সর্বব্যাপী নকশা বা মাস্টারপ্ল্যানের মাধ্যমে ঘটেনি; বরং নদীপথ, মহল্লা, দুর্গ, বাজার ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের সমন্বয়ে নগরটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিকশিত হয়েছিল।
পরবর্তীকালে কলকাতায় ঔপনিবেশিক শাসন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা বিস্তৃত হওয়ার পর ঢাকার অবস্থান বদলে যায় এবং শহরকে ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণের প্রশাসনিক প্রবণতা তৈরি হয়। এর ফলে জন্ম নেয় স্থানিক বিভাজন; একদিকে শাসক ও অভিজাতদের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা ও উন্নত নাগরিক সুবিধা, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের বসতি ও শ্রমজীবী এলাকা। ঢাকায় রমনা ও মিন্টো রোডকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা প্রশাসনিক এলাকা এর একটি বড় ঐতিহাসিক উদাহরণ। ১৯১৭ সালে প্যাট্রিক গেডেস ঢাকার নগর-পরিকল্পনা বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন তৈরি করেন, যেখানে জলাভূমি, সবুজ স্থান ও সামাজিক জীবনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। তবে তৎকালীন ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার প্রশাসনিক ক্ষমতা সাধারণ নগরজীবনের সঙ্গে স্পষ্ট দূরত্ব বজায় রেখেছিল।
১৯৫৬ সালে ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) প্রতিষ্ঠা এবং ১৯৫৯ সালে মিনোপ্রিও, স্পেন্সলি ও ম্যাকফারলেনের মহাপরিকল্পনার মধ্য দিয়ে ঢাকাকে আলাদা আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্পাঞ্চল হিসেবে বিন্যস্ত করার প্রবণতা স্পষ্ট হয়। ধানমন্ডি, গুলশান ও বনানীর মতো পরিকল্পিত আবাসিক এলাকার বিকাশ এই ধারারই অংশ। তবে সরকারি পরিকল্পনায় সব এলাকা সমান বরাদ্দ না পাওয়ায় ধানমন্ডির পাশের কলাবাগান বা কাঁঠালবাগানের মতো এলাকায় মানুষের নিজস্ব উদ্যোগ ও স্থানীয় আয়োজনে বসতি গড়ে তুলতে হয়েছে। ফলে পরিকল্পনা ব্যবস্থার ভেতরেই শহরের কিছু অংশকে বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত এবং বাকি অংশকে কেবল ‘সমস্যা’ হিসেবে দেখার মানসিকতা তৈরি হয়।
স্বাধীনতার পরও নতুন নতুন পরিকল্পিত এলাকা বা উপশহর গড়ার এই চিন্তায় মৌলিক পরিবর্তন আসেনি। উদাহরণ হিসেবে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের কথা বলা যায়। বিশাল আয়তনের এই প্রকল্পে প্লট, আবাসন ও নাগরিক সুবিধার রূপরেখা থাকলেও চারপাশের গ্রাম, কৃষিজমি, বিদ্যমান বসতি, নদী ও জলাভূমির পরিবেশগত বাস্তবতাকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে। এর ফলে শহরের মূল অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু পরিকল্পিত ‘দ্বীপ’ তৈরি হচ্ছে, যা রূপক অর্থে চারপাশের বিশাল অপরিকল্পিত ‘সমুদ্রকে’ উপেক্ষা করেই পরিকল্পিত হচ্ছে।
নাগরিক সুবিধার বণ্টনের দিকে তাকালেও সামাজিক বৈষম্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গুলশান, বনানী বা বারিধারার মতো সুবিধাজনক এলাকায় পরিষেবা নিয়ে যে মনোযোগ দেখা যায়, জুরাইন বা বহু নিম্ন আয়ের এলাকায় তা মেলা ভার। অথচ পরিচ্ছন্নতাকর্মী, বাসচালক, নির্মাণশ্রমিক, ফুটপাতের বিক্রেতা ও গৃহকর্মীদের অবদানেই নগরটির অর্থনীতি ও সামাজিক জীবন সচল থাকে। শহর পরিচালনায় নিয়মকানুনের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও অনানুষ্ঠানিক বসতি বা জীবিকার দাপ্তরিক স্বীকৃতি না থাকার অজুহাতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মৌলিক প্রয়োজনকে অদৃশ্য করে রাখা নগর-পরিকল্পনার একটি বড় দুর্বলতা।
নগর-কল্পনার আরেকটি সীমাবদ্ধতা হলো শহর ও প্রকৃতিকে পরস্পরের বিপরীত ধরে নেওয়া। নদীমাতৃক বদ্বীপে জলাভূমি ভরাট করে আবাসন তৈরি কিংবা খালকে নর্দমায় পরিণত করার পরিণতিতে শহরের স্বাভাবিক পানি ধারণক্ষমতা কমে যাচ্ছে এবং জলাবদ্ধতা ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ছে। ভূকম্পন, বন্যা, অতিবৃষ্টি ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো দীর্ঘমেয়াদি দুর্যোগ মোকাবিলায় শহরকে টেকসই করতে হলে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষ এবং বিপন্ন প্রতিবেশব্যবস্থাকে পরিকল্পনার মূল কেন্দ্রে আনতে হবে।
যানজট বা জলাবদ্ধতার মতো সংকট সমাধানে সড়কবিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী, স্থপতি কিংবা পরিবেশবিদরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নভাবে সমাধান খোঁজেন। কিন্তু শহর কেবল পৃথক সমস্যার সমাহার নয়, এটি মানুষ, প্রকৃতি, অর্থনীতি ও রাজনীতির এক আন্তঃসম্পর্কিত ব্যবস্থা। নতুন মহাপরিকল্পনা বা আইনি সংস্কারের পাশাপাশি শহরকে কেবল ভৌগোলিক সীমানা না ভেবে একটি সম্মিলিত জীবনব্যবস্থা হিসেবে কল্পনা করা প্রয়োজন। সরকার, বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ শ্রমজীবী মানুষকে সঙ্গে নিয়ে সর্বজনীন আলোচনা ও নতুন চিন্তার মাধ্যমেই কেবল বাংলাদেশের শহরগুলোর টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব।