আওয়ামী লীগের নাটকীয় মনোনয়নে বঙ্গভবনে যাওয়া মো. সাহাবুদ্দিন অবশেষে ৩ বছর ৩ মাস দায়িত্ব পালনের পর শুক্রবার পদত্যাগ করেছেন। ২০২৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি যখন রাষ্ট্রপতি পদে তাঁর নাম ঘোষণা করা হয়, তখন তা ক্ষমতাসীন দলটির অনেক জ্যেষ্ঠ নেতাকেও বিস্মিত করেছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা মিলে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে দলে আলোচনা ছিল। সংসদে আওয়ামী লীগের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় পরদিনই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন তিনি। তবে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নানা আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ক সঙ্গী করেই তাঁকে বিদায় নিতে হলো।
রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে সাহাবুদ্দিন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত দলটির জাতীয় সম্মেলনে তিনি নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্বও পালন করেন। জ্যেষ্ঠ নেতাদের বাদ দিয়ে তাঁকে কেন এই পদে আনা হলো, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা তখন দেওয়া হয়নি। উপরন্তু, সাবেক জেলা ও দায়রা জজ সাহাবুদ্দিনের ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার থাকাকালীন ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন ছিল।
দুদক আইনের ৯ ধারা অনুযায়ী, সাবেক কোনো কমিশনার প্রজাতন্ত্রের কোনো লাভজনক পদে নিয়োগ পাওয়ার যোগ্য নন। এই বিধানের কারণে তাঁর রাষ্ট্রপতি হওয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে দুটি রিট করা হয়েছিল। তবে হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগ রুলিং দেন যে, রাষ্ট্রপতির পদটি প্রজাতন্ত্রের কর্মে কোনো লাভজনক পদ নয় এবং এটি কোনো নিয়োগ নয়, বরং একটি নির্বাচন।
দুদকে থাকাকালীন পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের মামলার তদন্তে সাহাবুদ্দিনের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ২০১২ সালে সাতজনের বিরুদ্ধে করা মামলাটি ২০১৪ সালে প্রমাণ মেলেনি বলে চূড়ান্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে শেষ করা হয়। তবে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন অভিযোগ করেন, সাবেক চেয়ারম্যান এম বদিউজ্জামান ও কমিশনার সাহাবুদ্দিন প্রাথমিক প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তদন্তটি ধামাচাপা দিয়েছিলেন। অবশ্য এই অভিযোগ বিচারকভাবে প্রমাণিত হয়নি।
একইভাবে ২০১৫ সালে বেসিক ব্যাংকের ২ হাজার ৩৭ কোটি টাকা আত্মসাতের ৫৬টি মামলায় ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুসহ পরিচালনা পর্ষদের কাউকে আসামি না করায় দুদক প্রশ্নের মুখে পড়েছিল। পরবর্তীতে ২০২৩ সালে ৫৮টি মামলায় বাচ্চুকে আসামি করার পর তদন্ত কর্মকর্তারা আদালতে জানান যে, তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চাপের কারণে আগে পর্ষদ সদস্যদের আসামি করা যায়নি।
দুদক ছাড়ার পর ২০১৭ সালে বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিলে সাহাবুদ্দিন সেখানে স্বতন্ত্র পরিচালক ও ভাইস চেয়ারম্যান হন। তিনি এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের উপদেষ্টার দায়িত্বও পালন করেন। রাষ্ট্রপতি পদে মনোনীত হওয়ার পর ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি ব্যাংকটির পর্ষদ থেকে পদত্যাগ করলেও সমালোচকেরা তাঁকে ‘এস আলমের প্রতিনিধি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন।
সাহাবুদ্দিনের মেয়াদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগ নিয়ে তাঁর পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে। ওই দিন রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করার কথা বললেও, অক্টোবরে এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেন যে তাঁর কাছে এর কোনো দালিলিক প্রমাণ নেই। এই বক্তব্যকে মিথ্যাচার ও শপথ ভঙ্গ আখ্যা দিয়ে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল সমালোচনা করেন এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা বঙ্গভবন ঘেরাওসহ তাঁর পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করেন। পরে বঙ্গভবন থেকে এটিকে ‘মীমাংসিত বিষয়’ বলে বিবৃতি দেওয়া হয়।
সম্প্রতি লন্ডনে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় দিল্লিতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর ফোনালাপের খবর সংবাদমাধ্যমে এলে নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হয়। এছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা না নেওয়ার অভিযোগও ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ গঠনের পর প্রথম অধিবেশনে তাঁর ভাষণের সময় বিরোধী দলগুলো প্রতিবাদ ও ওয়াকআউট করে। এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম তাঁর শপথ ভঙ্গ ও আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ তুলে অভিশংসন ও গ্রেপ্তারের দাবি জানান। শেষ পর্যন্ত মেয়াদ পূর্ণ করার আগেই নানা বিতর্কের বোঝা মাথায় নিয়ে বঙ্গভবন ছাড়লেন মো. সাহাবুদ্দিন।