পেশায় নির্মাণ শ্রমিক পাবনার মো. সোহাগ বছরচারেক আগে জানতে পারেন তার ২৬ বছর বয়সী স্ত্রী সিমা আক্তার জন্মগত হার্টের ছিদ্র বা কনজেনিটাল হার্ট ডিজিজ সমস্যায় ভুগছেন। দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানান, ছিদ্রটি বড় হয়ে গেছে এবং ওপেন হার্ট সার্জারি ছাড়া উপায় নেই। একই সঙ্গে তারা রোগীকে বাঁচানোর ৫০ শতাংশ আশঙ্কার কথা জানান। এমন পরিস্থিতিতে শ্বশুরবাড়ির দেওয়া দুই লাখ ও নিজের জমানো দেড় লাখ টাকা নিয়ে ভারতের বেঙ্গালুরে ডা. দেবী শেঠি প্রতিষ্ঠিত নারায়ণা হেলথ হাসপাতালে যান সোহাগ। সেখানকার চিকিৎসকরা জানান, কোনো অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন নেই, কেবল নিয়মিত ওষুধ খেলেই চলবে। এই অভিজ্ঞতার পর দেশের চিকিৎসকদের ওপর আস্থা হারিয়েছেন সোহাগের মতো অনেক সাধারণ মানুষ।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এক দশক আগেও মূলত বিত্তশালীরা উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যেতেন। তবে বর্তমানে চিত্র বদলেছে। মধ্যবিত্তের পাশাপাশি নিম্ন-মধ্যবিত্তদের একটি বড় অংশও এখন বিদেশমুখী হচ্ছে। অন্যদিকে, দেশের ধনী ও ভিআইপিদের প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যাচ্ছেন। বাংলাদেশিদের কাছে চিকিৎসার প্রধান গন্তব্য হয়ে উঠেছে ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, নেপাল, চীন, মালয়েশিয়া, জাপান, কোরিয়া, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া।
বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার তালিকায় পিছিয়ে নেই দেশের রাষ্ট্রপতি, স্পিকার এবং মন্ত্রী-এমপিরাও। গত বছরের (২০২৫) ৮ মে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডের ব্যাংককে যান এবং এক মাস চিকিৎসা শেষে ৯ জুন দেশে ফেরেন। চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি নতুন সরকার গঠন করার পর, ৬ এপ্রিল দলটির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সস্ত্রীক সিঙ্গাপুরে যান নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য। এর পরের মাসে ৯ মে সদ্যবিদায়ি রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যের লন্ডনে যান। এছাড়া গত ১৯ জুলাই জাতীয় সংসদের স্পিকার (বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি) হাফিজ উদ্দিন আহমদ থাইল্যান্ডে যান এবং ২৪ জুলাই জরুরি প্রয়োজনে দেশে ফেরেন। ২১ জুলাই ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে যান এবং ২৪ জুলাই সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে তার হিপ রিপ্লেসমেন্ট অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়।
জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, দেশের চিকিৎসকরা রোগীদের পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে ভুল রোগ নির্ণয়সহ অন্তত ২১টি সুনির্দিষ্ট কারণে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমছে। সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান না থাকলেও প্রতিবছর ১০ লাখেরও বেশি মানুষ চিকিৎসার জন্য অন্তত ১৯টি দেশে যাচ্ছেন।
সম্প্রতি ঢাকা মেডিকেল কলেজে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দেশ থেকে প্রতিবছর চিকিৎসার জন্য বিপুল পরিমাণ মানুষ বিদেশে যাচ্ছেন। এর ফলে প্রতিবছর প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকা) বিদেশে চলে যাচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, রোগীদের প্রতি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্তরিক ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমেই দেশের স্বাস্থ্যসেবার ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এজন্য চিকিৎসকদের সময়নিষ্ঠা, দায়িত্ববোধ ও সহমর্মী আচরণ অত্যন্ত জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) গত ৫ মে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ২২ শতাংশ মানুষের প্রতি মাসে স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন হয়। তবে এই স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়ের ৭৯ শতাংশই রোগীদের নিজেদের পকেট থেকে মেটাতে হচ্ছে। গবেষকরা দেশের বর্তমান এই স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে একটি 'পশ্চাদগামী' ব্যবস্থা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএমসিএ) সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মো. মোয়াজ্জেম হোসাইন জানান, দেশের চিকিৎসাসেবায় কিছুটা উন্নতি হলেও অব্যবস্থাপনা ও মানসম্পন্ন চিকিৎসার ঘাটতি রয়ে গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পর্যটক ভিসায় দেশের বাইরে গিয়ে চিকিৎসার জন্য ব্যয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। তবে প্রকৃত ব্যয়ের পরিমাণ এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি।
গবেষণা অনুযায়ী, মূলত ১২টি রোগের চিকিৎসার জন্য মানুষ দেশের বাইরে যাচ্ছে। এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে হৃদরোগ (১৭ শতাংশ)। এছাড়া কিডনি রোগে ১৪.৫ শতাংশ, অর্থোপেডিক সার্জারিতে ১১.৫ শতাংশ, লিভার ও ক্যানসারে ১১ শতাংশ করে, নিউরোলজিতে ৯ শতাংশ, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি ও ইউরোলজিতে ৬ শতাংশ, নাক-কান-গলায় ৫ শতাংশ, জেনারেল সার্জারি ও গাইনোকলজিতে ৪ শতাংশ করে এবং চোখ ও দাঁতের চিকিৎসার জন্য ২ শতাংশ রোগী বিদেশে যাচ্ছেন।
বিপিএমসিএ’র সাবেক সভাপতি এম এ মুবিন খান মনে করেন, জটিল রোগ নির্ণয়ের ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশের স্বাস্থ্য খাতের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামাদির সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, স্বাস্থ্য খাতে মোট জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ বরাদ্দ এবং চিকিৎসক ও নার্সের অনুপাত ১:৩ হওয়া উচিত। অথচ বাংলাদেশে এই বরাদ্দ জিডিপির ১ শতাংশেরও কম, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। এমনকি এই সামান্য বরাদ্দও পুরোপুরি ব্যয় করতে পারে না স্বাস্থ্য খাত।
বর্তমানে বাংলাদেশে ভারতের ১৫টি ভিসা সেন্টার রয়েছে, যার মধ্যে যমুনা ফিউচার পার্কের ইন্ডিয়ান ভিসা অ্যাপ্লিকেশন সেন্টারটি এশিয়ার বৃহত্তম। এছাড়া ঢাকাতেই চীন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশের প্রায় শতাধিক হাসপাতালের লিয়াজোঁ অফিস রয়েছে। এসব অফিস নিয়মিত বিদেশি চিকিৎসক এনে রোগীদের ভিসা প্রসেসিং, থাকা-খাওয়া ও ভাষাগত সহায়তার মাধ্যমে বিদেশে যেতে উদ্বুদ্ধ করছে।
মালয়েশিয়া হেলথকেয়ার ট্রাভেল কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে মালয়েশিয়ায় প্রায় সাড়ে ৮ লাখ বিদেশি চিকিৎসা নেন, যেখানে অস্ট্রেলিয়ানদের পরই বাংলাদেশিদের অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। চীনের গুয়াংজু মর্ডান ক্যানসার হাসপাতালের ভাইস প্রেসিডেন্ট হি ল্যাং বিং এবং অনকোলজি বিশেষজ্ঞ ডা. উ উই জানান, বর্তমানে প্রতি মাসে গড়ে ৩০ জন বাংলাদেশি ক্যানসার রোগী তাদের হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যাচ্ছেন এবং এই সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে।
স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদদের মতে, আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালায় বিদেশে চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা ও খরচের বিষয়টি বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে যাচাই করা হতো। কিন্তু এখন যেকোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের প্রত্যয়নপত্র নিয়ে ব্যাংক থেকে ডলার নেওয়া যায়। নিয়মের এই শিথিলতার কারণে সামান্য অসুস্থতাতেও বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে, যা দেশের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা খরচের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশিরা ২০১৯ অর্থবছরে ২.২ মিলিয়ন, ২০২০ অর্থবছরে ১.৬ মিলিয়ন, ২০২১ অর্থবছরে ১.৬ মিলিয়ন এবং ২০২২ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ০.৫ মিলিয়ন ডলার বিদেশে চিকিৎসার জন্য ব্যয় করেছেন।
বর্তমানে দেশে মাউন্ট এলিজাবেথ, ব্যাংকক হাসপাতাল, অ্যাপোলো, বামরুনগ্রাদ ও সেন্ট্রাল জেনারেল হাসপাতালের মতো নামী প্রতিষ্ঠানের রেফারেল অফিস রয়েছে। এমনকি সিলেটসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরেও এসব হাসপাতালের সাব-অফিস খোলা হয়েছে। চেন্নাইয়ের শঙ্কর নেত্রালয়, খ্রিস্টান মেডিকেল কলেজ, দিল্লির ইসকট হার্ট ইনস্টিটিউট, মুম্বাইয়ের টাটা মেমোরিয়ালসহ বিভিন্ন হাসপাতালের প্রতিনিধিরা স্থানীয় কিছু চিকিৎসক ও হাসপাতালের সহযোগিতায় রোগীদের বিদেশে পাঠাতে কাজ করছে। তারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে রোগী দেখা ও ভিসা প্রসেসিংয়ের ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। ঢাকাস্থ ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ভারত সরকার বাংলাদেশিদের যে ১২ লাখ ভিসা দিয়েছে, তার মধ্যে প্রায় ৪ লাখই ছিল মেডিকেল ভিসা।
এই বিষয়ে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এমএ মুহিত জানান, বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধির বিষয়ে সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমে গিয়েছিল। তবে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতির উন্নয়নে কাজ করছে এবং ধীরে ধীরে মানুষের আস্থা ফিরছে। দেশের হাসপাতালগুলোতে মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা গেলে বিদেশমুখী রোগীর সংখ্যা কমবে এবং যাতায়াত ও অতিরিক্ত খরচের বোঝা থেকে রোগীরা রেহাই পাবেন।