যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সম্প্রতি তুরস্ক থেকে ফেরার সময় গোপনে একটি উড়োজাহাজে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এই ঘটনা এখন পর্যন্ত দেশটির কংগ্রেসকে জানানো হয়নি। গত মঙ্গলবার এই ঘটনায় কংগ্রেসে ব্রিফিং দাবি করেছেন দেশটির বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টির আইনপ্রণেতারা। তাঁরা প্রশ্ন তুলছেন, ওই ঘটনায় সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষকে কেন ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছিল।
গত মাসে মার্কিন গোয়েন্দারা জানতে পারেন, ইরান ট্রাম্পকে হত্যার পরিকল্পনা করেছে এবং হুমকিটি বিশ্বাসযোগ্য। এই খবর জানার পর ট্রাম্পকে একটি খাবার সরবরাহ বা ক্যাটারিংয়ের ট্রাকে করে এয়ারফোর্স ওয়ান থেকে বের করে নেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট প্রথমে এই খবর প্রকাশ করে। পরে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসও এ ঘটনা নিয়ে খবর প্রকাশ করে।
মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বহনকারী উড়োজাহাজ এয়ারফোর্স ওয়ানের একটি সাইড ডোর দিয়ে ট্রাম্পকে গোপনে বের করে নেওয়া হলেও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, মার্কিন প্রেসিডেন্টের সহকারী ও সাংবাদিক মিলিয়ে শতাধিক মানুষ ওই উড়োজাহাজে ছিলেন। হুমকির বিষয়টি তাঁদের না জানিয়ে উড়োজাহাজটি যুক্তরাজ্যের উদ্দেশে যাত্রা করে।
জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক উপরাষ্ট্রদূত নেড প্রাইস বলেন, এটি এমনভাবে করা সম্ভব ছিল, যাতে তাঁদের মিথ্যা বলতে হতো না। তাঁরা ট্রাম্পের সফরসঙ্গী সাংবাদিকদের জানাতে পারতেন। তিনি নিশ্চিত যে, নিরাপত্তার কিছু ব্যবস্থা সম্পর্কে সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ তাঁরা খুব স্বেচ্ছায় মেনে নিতেন।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দাবিষয়ক অ্যাডভোকেসি গ্রুপ স্টেডি স্টেটের নির্বাহী পরিচালক এবং সিআইএর সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা স্টিভেন ক্যাশ বলেন, এ ঘটনায় মনে হচ্ছে, ভাবনাটা এমন ছিল যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জায়গায় ১০০ বা তার বেশি মানুষকে ইরানিদের হত্যার সুযোগ দিয়ে আমরা তাঁর বিপদ কমাতে পারি।
ট্রাম্প গোপনে বিমান বদলের কথা মঙ্গলবার নিশ্চিত করেছেন। তবে তিনি বলেছেন, শেষ পর্যন্ত তিনি যে উড়োজাহাজে চড়ে যাত্রা করেছিলেন, সেটি এয়ারফোর্স ওয়ানের চেয়েও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, আমার মনে হয়, আমি যে বিমানে উড়াল দিয়েছিলাম, সেটিই আসলে বেশি ঝুঁকিতে ছিল। কারণ আমার মনে হয়, ইরানিরা ওই উড়োজাহাজটিকেই আক্রমণের জন্য বেশি উপযুক্ত বলে মনে করতে পারত। ট্রাম্প আরও বলেন, ঠিক আছে, এটা পুরোপুরি সিক্রেট সার্ভিসের বিষয়। তারা যা করতে চায়, আমি শুধু সেটা অনুসরণ করি। তাই সিক্রেট সার্ভিস ও সামরিক বাহিনীর নির্দেশনা মেনে চলি।
যুক্তরাষ্ট্রের কানেটিকাট অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্রেট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পকে গোপনে অন্য উড়োজাহাজে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাকে নজিরবিহীন, অদ্ভুত এবং চরম ভীতিকর হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, এ বিষয়ে কংগ্রেসকে অবশ্যই ব্রিফ করতে হবে। কারণ, এটি শুধু প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার বিষয় নয়। আমি জানতে চাই যে এয়ারফোর্স ওয়ানকে প্রেসিডেন্টের জন্য খুব ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করা হয়েছিল, সেই উড়োজাহাজে থাকা কর্মী ও সাংবাদিকদের নিরাপদ রাখতে কী ধরনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল?
৮ জুলাই ট্রাম্প তুরস্ক ত্যাগের আগে হোয়াইট হাউস জানিয়েছিল, প্রেসিডেন্ট এয়ারফোর্স ওয়ানে চড়ে যুক্তরাজ্যে যাবেন। টেলিভিশনের ক্যামেরার সামনে ট্রাম্পকে নির্ধারিত এয়ারফোর্স ওয়ানে উঠতে দেখা যায়। কিন্তু ওঠার কয়েক মিনিটের মধ্যে তাঁকে গোপনে বিমানবাহিনীর সি-৩২এ উড়োজাহাজে সরিয়ে নেওয়া হয়। পুরো ঘটনাটি এতটাই গোপনীয়তা বজায় রেখে করা হয়েছিল যে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সফররত সাংবাদিক ও হোয়াইট হাউসের কয়েকজন কর্মীও বিশ্বাস করেছিলেন, ট্রাম্প তাঁদের সঙ্গে এয়ারফোর্স ওয়ানেই রয়েছেন। যাত্রার সময় সাংবাদিকদের বলা হয়েছিল, তাঁরা যেন জানালার পর্দা টেনে রাখেন।
ঘটনার দিন ট্রাম্পকে বহনকারী সি-৩২এ সামরিক উড়োজাহাজটি ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ারফোর্সের ঘাঁটি আরএএফ মিলডেনহলে গিয়ে স্থানীয় সময় রাত প্রায় ১০টা ২০ মিনিটে অবতরণ করে। অন্যদিকে পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ান এবং তাতে ভ্রমণকারী সাংবাদিকদের দলটি কয়েক মিনিট পর সেখানে পৌঁছায়। তখন আলোকচিত্রীরা মার্কিন প্রেসিডেন্টের উড়োজাহাজ এয়ারফোর্স ওয়ান থেকে ট্রাম্পের নামার ছবি তোলেন। ধারণা করা হচ্ছে, গোপনে তাঁকে আবার ওই উড়োজাহাজে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। এরপর ট্রাম্প ঘাঁটিতে সেনাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। পরে কাতারের দেওয়া বোয়িং ৭৪৭ উড়োজাহাজে ওঠেন তিনি এবং সেই উড়োজাহাজেই ওয়াশিংটনের উদ্দেশে রওনা হন।
নেড প্রাইস বলেন, একবার সবকিছু বলে কাজটি শেষ হলে এবং প্রেসিডেন্ট নিরাপদে যুক্তরাজ্যে বা অ্যান্ড্রুজ বিমানঘাঁটিতে পৌঁছানোর পর তাঁদেরকে বলা যেত, আমরা এ কাজটি করেছি এবং এ কারণে এটা করতে হয়েছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, সত্য বলার প্রতি তাঁদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। সত্যের প্রতি তাঁদের কোনো আনুগত্যও নেই। বরং এক মাস ধরে বিষয়টি নিয়ে শুধু মিথ্যা বলা ও মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা হয়েছে।
সাংবাদিকেরাও এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সিএনএনের উপস্থাপক জেক ট্যাপার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, অবশ্যই প্রেসিডেন্টের জীবন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমি যেসব কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছি, তাঁদের কেউই আগে কখনো এমন ঘটনা শোনেননি, যেখানে আসন্ন হুমকি মোকাবিলায় হোয়াইট হাউসের কর্মী ও সাংবাদিকদের নিয়ে পুরো এয়ারফোর্স ওয়ানকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
সাংবাদিকদের সুরক্ষার জন্য কাজ করা কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টসের আমেরিকা অঞ্চলের পরিচালক হোসে জামোরা বলেছেন, সাংবাদিকেরা যে অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকির মধ্যে পড়েছিলেন, সেটা যেন না হয় তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ছিল প্রশাসনের। তিনি বলেন, বিশ্বাসযোগ্য নিরাপত্তা হুমকি সম্পর্কে সাংবাদিকদের জানানো উচিত, যাতে তাঁরা নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়ে জেনেবুঝে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
এই তথ্য প্রকাশের পর কাতারের দেওয়া উড়োজাহাজটির নিরাপত্তা নিয়ে আগে থেকে ওঠা প্রশ্ন নতুন মাত্রা পেয়েছে। ট্রাম্প ন্যাটো সম্মেলনে কাতারের দেওয়া উড়োজাহাজটি নিয়ে গিয়েছিলেন। এটিই ছিল উড়োজাহাজটির প্রথম আন্তর্জাতিক যাত্রা। কিন্তু ফেরার পথে প্রথম ধাপে তিনি সেটি ব্যবহার না করে পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ান ব্যবহার করবেন বলে হঠাৎ ঘোষণা দেন। তখন ট্রাম্প বলেছিলেন, নতুন উড়োজাহাজটি মিলডেনহলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, যাতে সেখানে অবস্থানরত মার্কিন সেনারা সেটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে পারেন। পরে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ও সিবিএস নিউজ জানায়, ইরানের সঙ্গে সংঘাত বাড়তে থাকায় ট্রাম্প বা তাঁর উড়োজাহাজে সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা উদ্বেগ জানিয়েছিলেন।
তুরস্কে ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলন চলাকালে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানে বড় ধরনের হামলা চালাচ্ছিল। ফলে ইরানের পাল্টা হামলার আশঙ্কাও বেড়ে যায়। তবে নতুন তথ্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, হুমকি যতটা ছিল, বাস্তবে সেটাকে তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের পারমাণবিক নীতি কর্মসূচির ফেলো অঙ্কিত পান্ডা বলেন, ইরানের দিক থেকে এত গভীরে গিয়ে প্রেসিডেন্টের উড়োজাহাজে হামলার চেষ্টা চালানো খুবই অসম্ভব।
ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ডিস্টিংগুইশড ফেলো জেফরি লুইস বলেন, আঙ্কারা থেকে কোনো উড়োজাহাজ উড্ডয়নের সময় সেটিকে নিশানা করার মতো ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের নেই। তবে তাত্ত্বিকভাবে রানওয়েতে থাকা উড়োজাহাজে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালাতে পারে ইরান। কিন্তু সেটা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম বলে মনে হয়। জেফরি লুইস ধারণা, মার্কিন কর্মকর্তারা সম্ভবত সন্ত্রাসী ধরনের হামলা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন।
তুরস্কে দায়িত্ব পালন করে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলে উপ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেমস জেফরি মনে করেন, ট্রাম্পকে অন্য একটি উড়োজাহাজে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি গোপন রাখার ঘটনা ইঙ্গিত দেয়, হুমকির বিষয়ে মার্কিন গোয়েন্দাদের কাছে গুরুতর তথ্য ছিল। জেফরি বলেন, এটি অত্যন্ত অস্বাভাবিক ঘটনা। এটি ইঙ্গিত দেয়, হুমকির বিষয়ে তাঁদের কাছে খুব ভালো গোয়েন্দা তথ্য ছিল এবং যে উড়োজাহাজে তিনি ছিলেন, সেটির ওপর তাঁরা আস্থা রাখেননি।
জেফরি মনে করেন, ওই গোয়েন্দা তথ্য ইসরায়েল থেকে আসতে পারে। তাঁর ভাষ্যমতে, ইসরায়েলি কর্মকর্তারা কখনো কখনো শুধু তথ্য দেওয়াই নয়, মার্কিন নীতিতেও প্রভাব বিস্তার করতে চান। তবে প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত কোনো হুমকি বানিয়ে বলার ঝুঁকি তাঁরা নেবেন না। জেফরি বলেন, প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার মতো গুরুতর বিষয় নিয়ে তাঁরা খেলা করবেন না।
উড়োজাহাজের জানালার পর্দা কেন টেনে দিতে বলেছে, সে বিষয়ে সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করলে ট্রাম্প তার উত্তরে নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আপনারা সম্ভবত একটি বিপজ্জনক ফ্লাইটে আছেন। তবে আমি গেলে আপনারাও যাবেন। ঠিক তো? পরে এয়ারফোর্স ওয়ানকে লক্ষ্য করে ইরানের কোনো বিশ্বাসযোগ্য হুমকি ছিল কি না, এ প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, আমি তো সব সময় হুমকির মধ্যে আছি। তাদের তালিকায় আমি এক নম্বরে—আপনাদের আগে। তবে প্রেসিডেন্টকে অন্য উড়োজাহাজে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা এবং বিষয়টি নিয়ে সংবাদমাধ্যম ও সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে হোয়াইট হাউস পরেও ঘটনাটিকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করতে থাকায় এসব প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।