‘ফার্স্ট বাংলাদেশ’ নীতিকে মূলমন্ত্র করে দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ছয় মাসে বিএনপি সরকার পররাষ্ট্র ও কূটনৈতিক নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। ক্ষমতায় আসার ৬ মাস পর কূটনৈতিক বড় অর্জন থাকলেও সরকারের সামনে এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো বৃহৎ শক্তির প্রভাব এবং তাদের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের গভীরতা পর্যবেক্ষণে রয়েছে বিশ্বমহল। এছাড়া বিএনপি সরকারের প্রথম কয়েক মাসের মধ্যেই জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদ অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচন হয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, যা একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য।
বর্তমান সরকারের শুরু থেকেই ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জল ঘোলা রয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এবং শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় ও সেখান থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদান ইস্যুতে ঢাকা তার অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। সীমান্তে পুশ-ইন, গঙ্গা চুক্তি ও ভিসা সংক্রান্ত জটিলতাসহ নানা ইস্যুতে সম্পর্কের উন্নয়ন বারবার হোঁচট খাচ্ছে। কূটনৈতিক সূত্র বলছে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক একটি স্থিতিশীল পর্যায়ে নিতে না পারলে উভয় দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। শেখ হাসিনার দেশে প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে ভারতের দিক থেকে এখনো সুস্পষ্ট অবস্থান না থাকলেও এই ইস্যুতে দুই দেশের সম্পর্ক আর ক্ষতি করতে রাজি নয় বলে দেশটির পক্ষ থেকে জানানো হয়। ব্রিকস সম্মেলনের আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর ২০-২৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে দুই দেশের কূটনৈতিক সূত্রের দাবি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত ‘এগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড’ (এআরটি) শীর্ষক বাণিজ্য চুক্তিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে করা এই চুক্তির সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জড়িত ছিল। এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশি পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা হয়েছে। প্রতিরক্ষা বাণিজ্য সহজতর করা এবং নির্দিষ্ট মানদণ্ডে খাদ্য ও কৃষি পণ্য আমদানির মতো বিষয়গুলো এই চুক্তির অংশ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার দায়িত্ব গ্রহণের পর কৌশলগত নানা দিক বিবেচনায় ২১ ও ২২ জুন মালয়েশিয়া সফর করেন। দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই ছিল তার প্রথম বিদেশ সফর। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সাথে বৈঠকে শ্রমবাজার, ডিজিটাল অর্থনীতি ও সেমিকন্ডাক্টর খাতে সহযোগিতার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এরপর চীন সফরে ১৩১টি সমঝোতা স্মারক ও ৫টি অতিরিক্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন এবং তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের সহযোগিতার আশ্বাস অন্যতম। তবে এই সম্পর্ক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণে রয়েছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবিরের মতে, বর্তমান সরকার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা বজায় রেখে অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছে। তিনি মনে করেন, চীনের সাথে অর্থনৈতিক করিডরের প্রস্তাব বাস্তবায়নে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করতে হবে। একই সাথে ভারতের সাথে সম্পর্কের স্থবিরতা কাটিয়ে উঠতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর একটি ইতিবাচক মোড় নিতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।