৭ নভেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসের এমন একটি দিন, যা কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং জাতির চেতনায় স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। ১৯৭৫ সালের এই দিনে যখন দেশটি গভীর অনিশ্চয়তা ও ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি হয়েছিল, তখন দেশপ্রেমিক সিপাহি-জনতা রাজপথে নেমে এসে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছিল। সেই উত্তাল সময়ে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জাতির হাল ধরেন। ‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই’ স্লোগানের মাধ্যমে সেদিন একটি জাতির আত্মরক্ষার সম্মিলিত সংকল্প উচ্চারিত হয়েছিল। পাঁচ দশক পর আজ এই দিনের চেতনা কীভাবে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, গণতন্ত্রের বিকাশ এবং জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় পথ দেখাতে পারে, তা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রদর্শনের মধ্যেই নিহিত রয়েছে।
একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা তার কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা এবং জনগণের আস্থার ওপর নির্ভরশীল। ১৯৭৫ সালের নভেম্বরের শুরুতে সেই ভিত্তি যখন ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল, তখন সিপাহি-জনতার উত্থান সেই শূন্যতা পূরণ করে। সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরে আসে এবং রাষ্ট্র একটি দৃঢ় নেতৃত্ব পায়। জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রদর্শনে স্থিতিশীলতা মানে স্থবিরতা ছিল না, বরং শৃঙ্খলার ভেতর দিয়ে গতিশীলতা ছিল। তিনি কৃষি, উৎপাদন ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে মনোযোগ দিয়েছিলেন, কারণ তিনি জানতেন ক্ষুধা ও বেকারত্ব জিইয়ে রেখে স্থিতিশীলতা আনা অসম্ভব। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ‘থ্রি-আর’ কৌশল—পুনরুদ্ধার, পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন এবং ‘রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফা’ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে সেই স্থিতিশীলতাকে দীর্ঘমেয়াদি রূপ দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
৭ নভেম্বরের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী উত্তরাধিকার হলো বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনর্যাত্রা। ১৯৭৯ সালে অনুষ্ঠিত হয় বহুদলীয় সংসদ নির্বাচন। একদলীয় শাসনের রুদ্ধ পরিবেশ থেকে দেশ প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতির পথে ফিরে এসেছিল। শহীদ জিয়া বিশ্বাস করতেন, ভিন্নমতের সহাবস্থান ছাড়া গণতন্ত্র পূর্ণতা পেতে পারে না। তিনি গ্রাম সরকারব্যবস্থার মাধ্যমে তৃণমূলের মানুষকে উন্নয়নে সম্পৃক্ত করেছিলেন। আজকের দিনে সেই চেতনার আধুনিক রূপ হলো একটি স্বায়ত্তশাসিত স্থানীয় সরকারব্যবস্থা এবং মুক্ত গণমাধ্যম। গণতন্ত্রকে টেকসই করতে হলে জাতীয় সংসদকে রাজনীতির প্রকৃত কেন্দ্রে পরিণত করতে হবে, যেখানে সরকারি ও বিরোধী দল পারস্পরিক জবাবদিহিতার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেবে।
‘সংহতি’ শব্দটি এই দিবসের মূল প্রাণ। ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ধর্ম, ভাষা ও নৃগোষ্ঠী-নির্বিশেষে সব নাগরিককে একটি অভিন্ন পরিচয়ে আবদ্ধ করেছে। অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা কর্মসূচি এবং খাল খননের মতো উদ্যোগগুলো কৃষক, শ্রমিক ও তরুণদের অভিন্ন লক্ষ্যে সংগঠিত করেছিল। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের যে পরিকল্পনা নিয়েছে, তা ৭ নভেম্বরের চেতনারই আধুনিক প্রকাশ। ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই উত্তরাধিকারকে রাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতায় যুক্ত করেছেন, যা প্রমাণ করে ৭ নভেম্বর-পরবর্তী উন্নয়নদর্শন আজও রাষ্ট্র পরিচালনার দিকনির্দেশক।
দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগ রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত না হওয়ার পর, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভা চলতি বছর ৭ নভেম্বরকে পুনরায় ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত করেছে এবং সাধারণ ছুটি পুনর্বহাল করেছে। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান আবারও প্রমাণ করেছে, জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছাই রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি। বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই চেতনা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে, যাতে তারা ৭ নভেম্বরকে কেবল অতীতের স্মৃতি নয়, বরং ভবিষ্যৎ নির্মাণের দিকনির্দেশনা হিসেবে গ্রহণ করে। সার্বভৌমত্ব রক্ষা, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং গণতান্ত্রিক অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করেই একটি আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।