দেশের শিল্পকারখানাগুলো এমনিতেই দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকটের কারণে ধুঁকছিল, তার ওপর সাম্প্রতিক বিদ্যুৎ সংকট সামাল দেওয়ার নামে শিল্প খাতের বরাদ্দ থেকে ২০-২৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস বিদ্যুৎ খাতে স্থানান্তর করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে শিল্প খাত এখন মারাত্মক সংকটের মুখে পড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিল্পকারখানাকে ক্ষতিগ্রস্ত না করেই বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ ছিল। দৈনিক ৫৪ থেকে ৬০ কোটি টাকার ফার্নেস অয়েলের ব্যবহার বাড়ালেই শিল্পের জন্য বরাদ্দ গ্যাস কমানোর প্রয়োজন হতো না।
বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে এলএনজি কার্গোর অভাবে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল এক সপ্তাহ ধরে অলস বসে থাকার বিষয়টি উঠে আসে। প্রধানমন্ত্রী মাতারবাড়ীতে আরও দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল-এফএসআরইউ ও একটি এলপিজি টার্মিনাল এবং পায়রায় একটি এফএসআরইউ বসানোসহ বিভিন্ন নির্দেশনা দ্রুত বাস্তবায়নের অগ্রগতি জানতে চান। দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুতের চাহিদা বিবেচনা করে পরিকল্পনা নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে তিনি শিল্প খাতের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন এবং দ্রুত সমস্যা সমাধানের তাগিদ দেন।
গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে সারা দেশের গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমতে শুরু করে। পরিস্থিতি আরও জটিল হয় ১৩ আগস্ট থেকে, যখন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ দৈনিক গ্যাস বরাদ্দ ৭২ কোটি থেকে বাড়িয়ে ৯৫ কোটি ঘনফুট করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই বাড়তি গ্যাস মূলত শিল্প খাত থেকেই কেটে নেওয়া হয়েছে, ফলে গত ১৫ দিন ধরে শত শত কারখানা প্রয়োজনীয় গ্যাস পাচ্ছে না। তিতাস গ্যাস কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ জানান, গ্যাসের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ নিয়ে অসংখ্য শিল্পমালিক তার কাছে আসছেন, যদিও আপাতত কোনো সমাধান নেই।
বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টায় সারা দেশে ২১৯ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। এর মধ্যে সামিট গ্রুপের টার্মিনাল থেকে এসেছে ৫৭ কোটি ঘনফুট। তিতাস ও পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, এই ২১৯ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুটের মধ্যে বিদ্যুতের জন্য ৯৫ কোটি ঘনফুট, সার কারখানার জন্য ২০ কোটি ঘনফুট এবং শিল্পকারখানার জন্য ৮০ থেকে ৮৫ কোটি ঘনফুট বরাদ্দ দেওয়া হয়। বাকিটা সিএনজি স্টেশন, বাসাবাড়ি ও বাণিজ্যিক গ্রাহকদের দেওয়া হয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ১০ আগস্ট বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস বরাদ্দ ছিল গড়ে ৬৬ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ-পিজিসিবির হিসাব অনুযায়ী ওইদিন সন্ধ্যা ৭টায় বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় ৪ হাজার ১৫৭ মেগাওয়াট। ১২ আগস্ট থেকে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের বরাদ্দ বাড়িয়ে ৭২ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট করা হয়। এই গ্যাস দিয়ে ১২ আগস্ট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় সর্বনিম্ন ৩ হাজার ৯৫৬ মেগাওয়াট (বিকাল ৪টায়) এবং সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৪২৬ মেগাওয়াট (রাত ৯টায়)।
পেট্রোবাংলা এবং পিডিবির হিসাব অনুযায়ী ১৪ আগস্ট ৯৩ কোটি ১০ লাখ ঘনফুট, ১৭ আগস্ট ৯৩ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট, ১৮ আগস্ট ৯৩ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট এবং ১৯ আগস্ট ৯২ কোটি ঘনফুট গ্যাস বরাদ্দ দেওয়া হয় বিদ্যুৎ খাতে। এই গ্যাস দিয়ে ১৪ আগস্ট সর্বোচ্চ ৫ হাজার ২০১ মেগাওয়াট (বিকাল ৪টায়), ১৮ আগস্ট সকালে ৫ হাজার ৪২৪ মেগাওয়াট এবং ১৯ আগস্ট ৫ হাজার ২০২ মেগাওয়াট (বিকাল ৫টায়) বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। অর্থাৎ ২০ থেকে ২২ কোটি ঘনফুট গ্যাস বেশি পেয়ে বিদ্যুৎ খাতে উৎপাদন বেড়েছে মাত্র ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। পিডিবি জানিয়েছে, মূলত বন্ধ আশুগঞ্জ দক্ষিণ ও পূর্ব ইউনিট, শাহজীবাজার ৩৩০ মেগাওয়াটের একটি ইউনিট এবং মেঘনাঘাট কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। এছাড়া সিরাজগঞ্জসহ কয়েকটি কেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে।
অন্যদিকে একই সময়ে দেশের বেশির ভাগ ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রকে (উৎপাদনক্ষমতা ৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি) অলস বসিয়ে রাখা হয়েছে। ১৯ আগস্ট বুধবার রাত ১১টায় ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ দেওয়া হয়েছে ৩ হাজার ১৫৭ মেগাওয়াট। আর বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টায় দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৯৫৯ মেগাওয়াট। পেট্রোবাংলা ও পিডিবির একাধিক কর্মকর্তা জানান, সরকার চাইলে এই আপৎকালীন ফার্নেস অয়েল থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ নিতে পারে। ৫০ মেগাওয়াটের একটি কেন্দ্র রাত-দিন চালালে ফার্নেস অয়েল লাগে ২ লাখ ৭২ হাজার লিটার। ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের পরিবর্তে ফার্নেস অয়েল দিয়ে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করলে প্রতিদিন ৫৪ লাখ ৪০ হাজার লিটার ফার্নেস অয়েল লাগবে, যার জন্য সরকারকে প্রতিদিন বাড়তি ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা খরচ করতে হবে।
এ বিষয়ে ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য এবং জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম তামিম বলেন, যদি দৈনিক ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকার তেল দিয়ে ১ থেকে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো যায়, তাহলে সরকারকে এই মুহূর্তে এটাই করা উচিত। কারণ শিল্পকে বাঁচানো দরকার, তা না হলে দেশের অর্থনীতির বড় ক্ষতি হয়ে যাবে।