প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে দেশে অনলাইন জুয়া এক ভয়ংকর ও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন অ্যাপস, ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেইজ ব্যবহার করে এই অবৈধ বাণিজ্য পরিচালনা করছে সুসংগঠিত অপরাধী চক্র। তারা লোভনীয় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ ও যুবসমাজকে এই সর্বনাশা পথে আকৃষ্ট করছে। কেবল ভার্চুয়াল জগৎ নয়, এর পেছনে রয়েছে সুসংগঠিত আর্থিক অপরাধের নেটওয়ার্ক।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) তথ্যমতে, বাংলাদেশে পরিচালিত এসব জুয়ার ওয়েবসাইটে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রতিদিন ৭০০ থেকে ১০০০ কোটি টাকার ওপর লেনদেন হয়। এর একটি বড় অংশ ডিজিটাল হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৫ বছরে এই অবৈধ লেনদেন ২১ গুণ বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাতে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। এতে চাকরিজীবী, গৃহিণী, এমনকি জেলে ও কৃষকরাও জড়িয়ে পড়েছেন।
ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলামের ভাষ্যমতে, বাংলাদেশকেন্দ্রিক জুয়ার সাইটগুলোর অধিকাংশ নিয়ন্ত্রণ করেন চীনের নাগরিকরা। এই চক্রের মূল হোতা হিসেবে ‘নাতান’ নামে এক চীনা নাগরিকের নাম উঠে এসেছে, যারা ‘গো পে’ নামক কোম্পানির মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করত। ডিবির সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ জানান, দেশের চক্রগুলো মূলত কমিশন পাওয়ার ভিত্তিতে কাজ করে, কিন্তু মূল নিয়ন্ত্রণ থাকে দেশের বাইরে থেকে।
অনলাইন জুয়ার কারবার পরিচালনার জন্য রয়েছে বিশাল সিন্ডিকেট। তারা ফেসবুক, ইউটিউব ও টেলিগ্রাম চ্যানেলে বিজ্ঞাপন প্রচারের পাশাপাশি ওয়ানএক্সবেট, মেলবেট, লিনবেট, সেফিয়ারবেট, বেট অন গেম, মেগাপারি, পিন-আপ বেট, বাজিওকে ও ফেয়ারপ্লে’র মতো সাইটগুলো ব্যবহার করছে। বিটিআরসি এসব সাইট বন্ধের উদ্যোগ নিলেও তারা নাম পরিবর্তন বা সামান্য কৌশলে বারবার ফিরে আসছে। সিআইডি প্রধান ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মোশাররফ হোছাইন জানান, সিআইডির বিশেষায়িত ইউনিট এসব সাইট নিয়মিত মনিটরিং করছে এবং সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে বিটিআরসিকে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানানো হচ্ছে।
অপরাধী চক্রগুলো এমএফএস প্ল্যাটফর্মকে তাদের লেনদেনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে। সাধারণ মানুষের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে হাজার হাজার বেনামি অ্যাকাউন্ট খুলে জুয়ার চিপস কেনাবেচা ও অর্থ লেনদেনের কাজ করা হয়। পরবর্তীতে এই অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করে বিদেশি মালিকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে, যা দেশের রিজার্ভের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিএফআইইউ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ইতোমধ্যে জুয়া ও ডিজিটাল হুন্ডির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ৫৫ হাজারেরও বেশি এমএফএস অ্যাকাউন্ট অবরুদ্ধ করেছে এবং অনেক এজেন্টের অনুমোদন বাতিল করা হয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল ওয়েবসাইট ব্লক করা যথেষ্ট নয়; এই অপরাধ দমনে মূল হোতা এবং অসাধু এমএফএস এজেন্টদের কঠোর আইনের আওতায় আনা জরুরি।