মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর সরাসরি প্রভাবে বাংলাদেশ এখন স্পট মার্কেট থেকে দ্বিগুণেরও বেশি দামে এলএনজি কিনতে বাধ্য হচ্ছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে যুদ্ধ শুরুর আগে সরকার প্রতি মেট্রিক মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) এলএনজি ১০ থেকে ১২ ডলারে কিনত। বর্তমানে সেই দাম ২৪ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এতে প্রতি কার্গো এলএনজির খরচ ৪১০-৪৯০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে এখন হাজার কোটি টাকার উপরে দাঁড়িয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাজ্য থেকে বাড়তি দামে দুটি কার্গো এলএনজি আমদানির প্রক্রিয়া শুরু করেছে। গত ২৪ আগস্ট ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে দক্ষিণ কোরিয়ার পসকো ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন থেকে ২৪.৬২৫ ডলার এবং যুক্তরাজ্যের টোটাল এনার্জিস গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড থেকে ২৪.২৫ ডলার দরে কার্গো কেনার সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়। এতে প্রতিটি কার্গোর ব্যয় পড়ছে ১ হাজার ১৩ কোটি টাকা। আগস্টের শুরুতেই সিঙ্গাপুরের আরামকো ট্রেডিং থেকে ২১.৫৫ ডলার দরে এক কার্গো, বিপি সিঙ্গাপুরের কাছ থেকে ২১.৮৭৮ ও ২১.৭৭৮ ডলার দরে দুই কার্গো এবং ১৯ আগস্ট আরামকো ট্রেডিংয়ের কাছ থেকে ২৩.৯৩ ডলার দরে আরও এক কার্গো এলএনজি কেনার সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়েছিল। এই দুই কার্গো সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সপ্তাহে দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হলে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এলএনজি আমদানি ব্যয় ৯০ হাজার কোটি থেকে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। ২০২৬ সালের পরিকল্পনা অনুযায়ী সরকার এ বছর ১১৫ কার্গো এলএনজি আমদানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। তবে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) মিজানুর রহমান জানান, ভাসমান টার্মিনালগুলোর পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালনা সম্ভব না হওয়ায় প্রকৃত আমদানি কিছুটা কম হতে পারে। অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ১৫ কার্গো এলএনজি আমদানিতে ইতিমধ্যে ১৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
বাংলাদেশ ২০১৮ সালে প্রথম এলএনজি আমদানি শুরু করে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪৩ কার্গো আমদানিতে ব্যয় হয় ১৮ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ৪০ কার্গো, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ৩৯ কার্গো, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪০ হাজার ৫৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪৪ কার্গো, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩৫ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩৯ কার্গো এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪০ কার্গো এলএনজি আমদানি করা হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৮৬ কার্গো আমদানিতে ব্যয় হয় ৪০ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা এবং সদ্যবিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১০৯-১১৩ কার্গো আমদানিতে ব্যয় হয় ৫৯ হাজার ৭১৩ কোটি টাকা, যেখানে ভর্তুকি দিতে হয় ১৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের বাজেটে এলএনজি আমদানির জন্য ৬,৫০০ কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ থাকলেও দেড় মাসেই তার ৪৩ শতাংশ শেষ হয়ে গেছে।
মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে কাতার এনার্জি তাদের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির প্রায় অর্ধেক সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত কাতার থেকে আটটি কার্গো এলেও পরে সরকার স্পট মার্কেটে ঝুঁকতে বাধ্য হয়। আগস্ট মাসেই গ্রিডে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ৯টি কার্গো আনার প্রস্তুতি নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে বছরের প্রথম আট মাসে ৪০-৫০টি কার্গো দেশে এসেছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অনারারি অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম বলেন, গত ১৭ বছরে জ্বালানি-সমৃদ্ধ বাংলাদেশকে আমদানিনির্ভর করে ফেলা হয়েছে। তিনি নিজস্ব গ্যাসকূপ থেকে উত্তোলন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, মাটির নিচে প্রচুর গ্যাস থাকা সত্ত্বেও অনুসন্ধান ও উত্তোলনে মনোযোগ না দিয়ে আমদানির দিকে ঝুঁকে বৈদেশিক মুদ্রা নষ্ট করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এমন সংকট এড়াতে দেশি বিশেষজ্ঞদের কাজে লাগিয়ে স্থলভাগে অনুসন্ধান এবং গভীর সমুদ্রে বিদেশিদের মাধ্যমে উত্তোলনের পরামর্শ দেন তিনি।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে স্পট মার্কেট থেকে দ্বিগুণের বেশি দামে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কিনতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর আগে স্পট মার্কেট থেকে সরকার প্রতি মেট্রিক মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) এলএনজি ১০-১২ ডলারে কিনত। কিন্তু বর্তমানে কিনতে হচ্ছে ২৪ ডলারেরও বেশি দরে। ফলে ৪১০-৪৯০ কোটি টাকার প্রতি কার্গো এলএনজির দাম এখন পড়ছে হাজার কোটি টাকার ওপরে।