ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের মতো জঘন্য অপরাধে অপ্রাপ্তবয়স্ক তথা শিশু-কিশোরদের জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে কন্যাশিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার ঘটনায় ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সী কিশোরদের অভিযুক্ত হওয়া এবং গ্রেফতারের ঘটনা গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রতিবেদন এবং সাম্প্রতিক বিভিন্ন মামলা বিশ্লেষণ করে এই চিত্র উঠে এসেছে। অথচ, ব্র্যাকের এক গবেষণা অনুযায়ী, দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ।
সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার দিকে তাকালে এই ভয়াবহতার চিত্র স্পষ্ট হয়। গত ৩০ আগস্ট ভোলার মনপুরায় বিস্কুটের প্রলোভন দেখিয়ে ৬ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এর আগে, ২৬ আগস্ট ঢাকার সাভারে ৭ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার মামলায় ১৫ বছর বয়সী এক কিশোর গ্রেফতার হয়। এছাড়া, ৫ আগস্ট রাজবাড়ীর পাংশায় ৬ বছরের এক কন্যাশিশুকে ভয় দেখিয়ে ধর্ষণের অভিযোগে অপর এক ১৫ বছরের কিশোরকে গ্রেফতার করা হয়।
আদালতের রায়েও অপ্রাপ্তবয়স্কদের সাজার নজির দেখা গেছে। চলতি বছরের ৬ এপ্রিল জামালপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক মোহাম্মদ আব্দুর রহিম ৫ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের দায়ে ১০ বছর বয়সী এক ছেলেকে ১০ বছরের আটকাদেশ দেন। ২০২৪ সালের ১৯ মার্চ দেওয়ানগঞ্জ থানা এলাকায় ঘটা ওই ঘটনার পর অভিযুক্ত শিশুটিকে গ্রেফতার করা হয়েছিল, যে বর্তমানে গাজীপুর শিশু সংশোধনাগারে রয়েছে। একইভাবে, ২০২১ সালের ৭ জুলাই বরগুনায় সংঘটিত ধর্ষণের ঘটনায় করা মামলায় ১৫ বছরের এক কিশোরকে ১০ বছরের আটকাদেশ দেওয়া হয়েছে।
আসকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত দেশে ১১৮টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং ৪৬ জন শিশু ধর্ষণচেষ্টার মুখোমুখি হয়েছে। ধর্ষণের পর ১৪ শিশুকে হত্যা করা হয়েছে এবং ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হত্যা করা হয়েছে আরও ৩ শিশুকে। এছাড়া, গত আগস্ট মাসে ধর্ষণের শিকার হওয়া ৫৪ শিশুর মধ্যে ৩৬ জনই ছিল কন্যাশিশু, যার মধ্যে ৮ জন দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়। এসব ঘটনার অনেকগুলোতেই অপ্রাপ্তবয়স্কদের সম্পৃক্ততা মিলেছে এবং পুলিশ বেশ কয়েকজন কিশোরকে গ্রেফতার করেছে。
অন্যান্য জেলা থেকেও এমন আশঙ্কাজনক খবর আসছে। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি চাঁদপুরের শাহরাস্তিতে ৪ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে পুলিশ তিন কিশোরকে গ্রেফতার করে। ওই মামলায় ১৯ বছর বয়সী দুজন এবং ১২ বছর বয়সী দুজনসহ চারজনকে আসামি করা হয়েছিল। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় একাধিকবার ধর্ষণের শিকার হয়ে এক কিশোরী গর্ভবতী হয়ে পড়ার ঘটনায় অভিযুক্ত এক কিশোরকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এছাড়া, গত ৪ জুলাই নেত্রকোনায় ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণের সহযোগিতার অভিযোগে ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা এই অবক্ষয়ের পেছনে আর্থসামাজিক তারতম্য ও মনস্তাত্ত্বিক সংকটকে দায়ী করছেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নূর মোহাম্মদ এ প্রসঙ্গে বলেন, অপ্রাপ্তবয়স্কদের দ্বারা কন্যাশিশু ধর্ষণের ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অপরাধে জড়ানো এসব কিশোরের অনেকেই বিকারগ্রস্ত কিংবা মাদকাসক্ত। সমাজ ও পরিবার থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে তাদের মধ্যে মায়া-মমতার মতো মানবিক অনুভূতিগুলো লোপ পায় এবং দৈনন্দিন টানাপোড়েন তাদের যৌন অপরাধের দিকে ধাবিত করে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, মধ্য ও উচ্চবিত্ত পরিবারের অনেক কিশোরই বর্তমানে ইন্টারনেট ও পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হয়ে পড়ছে। এই আসক্তি তাদের ভয়াবহ অপরাধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি প্রতিরোধে অভিভাবক, শিক্ষক ও সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সচেতন হতে হবে এবং সন্তানদের পর্নোগ্রাফি বা যে কোনো বিকৃত আসক্তি থেকে দূরে রাখতে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ধর্ষণ মামলায় ঠিক কতজন কিশোর গ্রেফতার হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নেই। তবে পুলিশ সদর দপ্তর ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় প্রাপ্তবয়স্কদের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরও অভিযুক্ত বা গ্রেফতার হচ্ছে। কিন্তু ব্র্যাকের ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পদ্ধতিগত প্রতিবন্ধকতা এবং তা নিরসনের উপায়’ শীর্ষক গবেষণা অনুযায়ী, এসব মামলায় আসামিদের সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ হওয়ায় অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে, যা সামগ্রিক বিচারব্যবস্থা ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।