নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে গাজী টায়ার্স কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার দুই বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এখনও খোঁজ মেলেনি সেই ধ্বংসস্তূপে নিখোঁজ হওয়া ১৮৬ জনের। তারা বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন, সেই চূড়ান্ত উত্তর আজও পাননি স্বজনরা। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আধুনিক প্রযুক্তিতে উদ্ধার অভিযান চালানোর সরকারি সুপারিশও দুই বছরে আলোর মুখ দেখেনি। প্রিয়জনদের ফেরার আশায় কিংবা অন্তত তাদের শেষ স্মৃতিটুকু পাওয়ার অপেক্ষায় দিন কাটছে শত শত পরিবারের।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণবিপ্লবে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর। রূপগঞ্জে সাবেক বস্ত্রমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীর মালিকানাধীন গাজী টায়ার্স কারখানায় হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটলে সেনাবাহিনী এর নিয়ন্ত্রণ নেয়। পরবর্তীতে ২৫ আগস্ট রাতে ঢাকা থেকে গোলাম দস্তগীর গাজীকে গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়। বিক্ষুব্ধ জনতা আবারও কারখানার ছয়তলা মিক্সিং ভবনে হামলা চালায়। ভাঙচুর ও লুটপাটের একপর্যায়ে ভবনটিতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। একই সময়ে বাইরে থেকে ভবনের মূল ফটকে তালা মেরে দেওয়া হলে ভেতরে আটকা পড়েন বহু মানুষ, যারা আর কখনো ফিরে আসতে পারেননি।
আগুনের তীব্রতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিটকে টানা ৩২ ঘণ্টা কাজ করে তা নিয়ন্ত্রণে আনতে হয়েছিল। অগ্নিকাণ্ডের পর নিখোঁজদের ছবি নিয়ে কারখানার সামনে জড়ো হন স্বজনরা। পরে ফায়ার সার্ভিস ও প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে স্বজনদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একটি প্রাথমিক তালিকা তৈরি করা হয়। জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটির নিবিড় যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্তভাবে ১৮৬ জন নিখোঁজের তালিকা প্রকাশ করা হয়।
এই ঘটনার পর কারখানা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে অনধিকার প্রবেশ, হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং মালামাল লুটপাটের অভিযোগে একাধিক মামলা করা হলেও নিখোঁজ ১৮৬ জনের স্বজনদের পক্ষ থেকে কোনো নিখোঁজ বা অপমৃত্যুর মামলা করা হয়নি। এটি আজও এক বড় রহস্য হিসেবে রয়ে গেছে। স্থানীয়দের কেউ কেউ এর পেছনে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুললেও তার কোনো স্বাধীন প্রমাণ মেলেনি। এদিকে নিখোঁজদের পরিবারগুলো আইনি ও আর্থিক জটিলতায় জর্জরিত। মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়ায় তারা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি বিক্রি বা হস্তান্তর করতে পারছেন না, মিলছে না প্রয়োজনীয় সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও ডেথ সার্টিফিকেটও।
নিখোঁজদের স্বজনদের প্রতিটি ঘরে এখন কেবলই হাহাকার। কাহিনা এলাকার নিখোঁজ ফয়সাল ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। নিখোঁজ হওয়ার সময় তার স্ত্রী নাছিমা পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন, যার বর্তমান সন্তানের বয়স এখন দেড় বছর। বাবার মুখ না দেখেই বড় হচ্ছে সে। মৈকুলির রোকেয়া বেগম হারিয়েছেন তার দুই ছেলে ও মেয়ের জামাইকে। কাজীপাড়ার তানিয়াকে এখন স্বামীর অনুপস্থিতিতে সংসারের হাল ধরতে জামদানি শ্রমিকের কাজ করতে হচ্ছে।
নিখোঁজ মিজানের বোন জানান, তার ভাই বন্ধুদের সাথে কেবল পরিস্থিতি দেখতে গিয়েছিলেন। কিন্তু এখন চোর বা লুতরাজকারী বলে অপবাদ দেওয়া হচ্ছে, যা নিখোঁজের বেদনার চেয়েও বেশি যন্ত্রণাদায়ক। মিজান যখন নিখোঁজ হন তখন তার ছেলের বয়স ছিল মাত্র চার মাস, যে এখন হাঁটতে ও বাবাকে ডাকতে শিখেছে। স্বজনদের দাবি, তারা সাধারণ মানুষ এবং কারও কাছে বিচার চাওয়ার সামর্থ্য তাদের নেই, তারা শুধু সত্যটা জানতে চান।
ঘটনার পর জেলা প্রশাসনের গঠিত আট সদস্যের তদন্ত কমিটি একটি ৩২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল। সেখানে ঘটনাটিকে অগ্নিসংযোগ হিসেবে উল্লেখ করে পোড়া ভবনটি অপসারণ এবং আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে উদ্ধার অভিযান চালানোর সুপারিশ করা হয়েছিল, যা দুই বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি। তবে ধ্বংসস্তূপ থেকে বিভিন্ন সময়ে মানুষের হাড় ও কঙ্কালের অংশ পাওয়ার দাবি উঠলেও সেগুলো কার তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা সহকারী পুলিশ সুপার (গ-সার্কেল) মেহেদী ইসলাম জানান, ১৮৬ জনের পরিচয় নিশ্চিতের পর সিআইডির মাধ্যমে ডিএনএ সংগ্রহ করে ফরেনসিক প্রোফাইল তৈরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। দ্রুতই এই পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে জমা দেওয়া হবে।