পলাতক শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বিগত আওয়ামী লীগ সরকার মাটির নিচের প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে চরম অনীহা প্রদর্শন করেছিল। প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮: ২৯। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দেশীয় বিশেষজ্ঞদের কাজে না লাগিয়ে সরকার আমদানির দিকে বেশি মনোযোগ দিয়েছিল। এর অংশ হিসেবে রাশিয়ান কোম্পানি গ্যাজপ্রমকে দিয়ে দ্বিগুণ ব্যয়ে গ্যাসকূপ খনন করানো হয় এবং বিতর্কিত ‘বিশেষ বিধান আইন, ২০১০’ প্রণয়ন করে রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং দেশীয় বিদ্যুতের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে তুলে দিতেই এমন নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সরকারি তিন প্রতিষ্ঠান বাপেক্স, বিজিএফসিএল ও এসজিএফএল এবং বিদেশি কোম্পানির মাধ্যমে সর্বমোট ৩৯টি নতুন গ্যাসকূপ খনন করা হয়, যাতে ব্যয় হয় প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। অথচ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সময়ে ১৫০ থেকে ২০০টি কূপ খননের প্রয়োজন ছিল। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নিয়ে পেট্রোবাংলার মাধ্যমে ১০০টি কূপ খননের প্রকল্প হাতে নিয়েছে এবং জ্বালানি ঘাটতি কমাতে এই লক্ষ্যমাত্রা ১৫০টিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা করেছে, যার ব্যয় ২৫ থেকে ২৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শেখ হাসিনা সরকার ভারতের ওপর আমদানিনির্ভরতা তৈরি করতেই দেশীয় অনুসন্ধান ও উৎপাদনে অনীহা দেখিয়েছিল। ২০১৪ সালে সমুদ্রসীমা জয়ের পরও গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এর বিপরীতে চড়া মূল্যে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি এবং ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতেই সরকারের বেশি আগ্রহ ছিল। বিশেষ করে ভারতের আদানি গ্রুপের সঙ্গে চুক্তিতে কঠিন শর্তে ক্যাপাসিটি চার্জ, কয়লার অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণ ও করের বোঝা বাংলাদেশের ওপর চাপানো হয়েছে, যা ছিল অত্যন্ত অসম।
‘বিশেষ বিধান আইন-২০১০’-এর ৯ নম্বর ধারার সুযোগ নিয়ে কোনো উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা ছাড়াই সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও এলএনজি আমদানির কাজ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে গত ১৫ বছরে অলস বসে থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে। বিপিডিবির তথ্যানুযায়ী, দেশে উৎপাদিত গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের ইউনিট খরচ ৪ থেকে ৪.৫০ টাকা হলেও, আদানি থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের গড় খরচ প্রতি ইউনিট ১৪.৮৭ থেকে ১৬ টাকা। ভারতের সেম্বকর্প এনার্জি ইন্ডিয়ার প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১০.২২ টাকা, পিটিসি ইন্ডিয়ার প্রতি ইউনিটের দাম ১০.২০ টাকা এবং এনভিভিএনের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৭.৫৮ টাকা। যদিও আমদানি করা কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী বাংলাদেশের মাতারবাড়ী, পায়রা বা রামপালের মতো বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে উৎপাদিত বিদ্যুতের গড় খরচ ৮ টাকা থেকে ১৩.৫৭ টাকা।
গ্যাজপ্রমকে দিয়ে কূপ খননের ক্ষেত্রেও চরম লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে। বাপেক্স নিজস্ব সক্ষমতায় ৬৫ থেকে ৮০ কোটি টাকায় কূপ খনন করতে পারলেও, গ্যাজপ্রমকে প্রতি কূপে ১৪০ থেকে ১৮০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, গ্যাজপ্রম নিজে সরাসরি কূপ খনন না করে ‘ইরিয়ল’ নামক একটি থার্ড-পার্টি বা তৃতীয় পক্ষ সাব-কন্ট্রাক্টর কোম্পানিকে দিয়ে কাজ করাতো। তদন্তে দেখা গেছে, ইরিয়ল কোম্পানি প্রতিকূপ ১৩৬ কোটি টাকায় খনন করার প্রস্তাব দিলেও, গ্যাজপ্রম মাঝখান থেকে প্রতি কূপে ১৮০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। ফলে শুধু ভোলার তিনটি কূপ থেকেই সরকারের অতিরিক্ত ১৩২ কোটি টাকা লোকসান হয়। এ টাকা থেকে সরকারের সর্বোচ্চ মহলও ভাগ পেতো বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া গ্যাজপ্রমের কারিগরি ত্রুটির কারণে খনন করা ১৭টি কূপের মধ্যে ৫টিই চালু হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অনারারি অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম বলেন, বাংলাদেশ খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ হলেও ফ্যাসিবাদী সরকার দেশীয় বিজ্ঞানীদের বসিয়ে রেখে আমদানির মাধ্যমে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা নষ্ট করেছে। ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি, ইকোনমি অ্যান্ড ফিন্যান্সের (আইইইএফএ) লিড এনার্জি অ্যানালিস্ট ড. শফিকুল আলমও একই মত প্রকাশ করে বলেন, সরকার আমদানির সহজ পথে না হেঁটে দেশীয় উৎপাদনে মনোযোগ দিলে আজ বাংলাদেশকে এই নজিরবিহীন ডলার সংকট ও বিদ্যুৎ বিপর্যয় মোকাবিলা করতে হতো না।