জার্মানির পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য স্যাক্সনি-আনহাল্টে গত রোববারের নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থী দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) বিপুল ব্যবধানে জয় পেয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই জয় ইউরোপের রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের পূর্বাভাস হতে পারে। নাৎসিবাদের অন্ধকার ইতিহাসের পর জার্মানি বরাবরই কট্টর ডানপন্থীদের ক্ষমতার বাইরে রাখার চেষ্টা করেছে, কিন্তু এবারের ফলাফল কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত এক দশক ধরে ইউরোপজুড়ে এ ধরনের দলগুলোর সমর্থন ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ইউরেশিয়া গ্রুপের ইউরোপবিষয়ক বিশ্লেষক মুজতবা রহমান বলেন, উন্নত ইউরোপ একধরনের জটিল রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সরকারগুলো মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সাধারণ ভোটারদের চাহিদার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর সমাধান করতে পারছে না। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও উচ্চ বেকারত্ব জার্মানির এই নির্বাচনে এএফডির জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নের (সিডিইউ) চেয়ে দ্বিগুণের বেশি ভোট পেয়েছে এএফডি। তবে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় এবং অন্য দলগুলো জোট গঠনে অস্বীকৃতি জানানোয় এএফডির সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এএফডির এই সাফল্য চ্যান্সেলর মের্ৎসের নেতৃত্বকে বড় সংকটের মুখে ফেলেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা প্রকাশ্যেই তাঁর ক্ষমতা হারানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছেন। জার্মানির গোয়েন্দা সংস্থা এএফডিকে ‘সন্দেহভাজন’ উগ্রপন্থী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে, কারণ দলটি অভিবাসীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ এবং নাৎসি স্লোগান ব্যবহারের মতো বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত।
আগামী বছর ফ্রান্স, স্পেন ও ইতালিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এসব দেশেও কট্টর ডানপন্থী দলগুলোর প্রভাব বাড়ছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ দায়িত্ব ছাড়ার পর ন্যাশনাল র্যালির মারিন লো পেনের জয়ের সম্ভাবনা প্রবল বলে জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি দ্বিতীয় দফার জরিপেও তিনি প্রথম হয়েছেন। লো পেন ১৪ বছর ধরে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট হওয়ার চেষ্টা করছেন। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক ফিলিপ মারলিয়েরের মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ফ্রান্স ও জার্মানিতে যে ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্য ছিল, তা এখন ১৬ বছর ধরে টিকে থাকার পর এখন ভেঙে পড়ার মুখে।
এদিকে, হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্তর অরবানের সাম্প্রতিক পরাজয় মূলধারার রাজনীতিকদের কিছুটা আশাবাদী করেছে। কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অধ্যাপক টিমোথি বেলের মতে, এএফডির সাফল্য নিয়ে কতটা উদ্বিগ্ন হতে হবে, তা নির্ভর করবে দলটি ক্ষমতায় গেলে কতটা স্বাভাবিক আচরণ করে এবং দক্ষতার সঙ্গে সরকার চালাতে পারে তার ওপর। বর্তমানে ইউরোপের চাপে থাকা মধ্যপন্থীরা আশা করছেন, ভোটাররা যুক্তরাষ্ট্রের অস্থিরতা থেকে শিক্ষা নিয়ে মূলধারার বাইরের দলগুলোর ওপর পরীক্ষা চালানোর ঝুঁকি এড়িয়ে চলবেন।