ফিফা বিশ্বকাপ কেবল বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ক্রীড়া আসরই নয়, বরং এর ট্রফি ও পুরস্কারগুলো ঘিরে রয়েছে ব্যাপক কৌতূহল। অনেকেই মনে করেন, বিশ্বকাপের ট্রফি বা স্বর্ণপদক খাঁটি সোনা দিয়ে তৈরি, তবে বাস্তবে এর নির্মাণপ্রক্রিয়া ও গঠন অনেকটাই আলাদা। ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে প্রথম বিশ্বকাপের সূচনা হয়, যেখানে বিজয়ী দলকে দেওয়া হতো ‘জুলে রিমে ট্রফি’। ফরাসি ভাস্কর আবেল লাফ্ল্যুরের নকশায় তৈরি এই ট্রফিটি ছিল স্বর্ণমণ্ডিত রূপার তৈরি, যার উচ্চতা ছিল প্রায় ৩৫ সেন্টিমিটার এবং ওজন ছিল ৩ দশমিক ৮ কেজি। নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দল তিনবার বিশ্বকাপ জিতলে ট্রফিটি তাদের স্থায়ীভাবে দেওয়া হতো। ১৯৭০ সালে ব্রাজিল তৃতীয়বারের মতো শিরোপা জিতে ট্রফিটি স্থায়ীভাবে নিজেদের দখলে নেয়। দুঃখজনকভাবে, ১৯৮৩ সালে রিও ডি জেনিরোতে ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশনের সদর দপ্তর থেকে ট্রফিটি চুরি হয়ে যায় এবং আজও তা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
জুলে রিমে ট্রফি স্থায়ীভাবে ব্রাজিলের কাছে চলে যাওয়ার পর ফিফা নতুন ট্রফি তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়। বিভিন্ন দেশের শিল্পীদের শতাধিক নকশার মধ্য থেকে ইতালির ভাস্কর সিলভিও গাজ্জানিগার নকশাটি নির্বাচিত হয়। ১৯৭৪ সাল থেকে এই ট্রফিটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে, যেখানে দুজন মানবাকৃতি পৃথিবীকে উপরে ধরে রেখেছে। এটি ঐক্য ও বৈশ্বিক ফুটবলের প্রতীক। বর্তমান ট্রফিটির উচ্চতা ৩৬ দশমিক ৮ সেন্টিমিটার এবং ওজন ৬ দশমিক ১৭৫ কেজি। এটি ১৮ ক্যারেট সোনা দিয়ে তৈরি, তবে এর ভেতরের অংশ ফাঁপা রাখা হয়েছে। যদি এটি সম্পূর্ণ নিরেট সোনা দিয়ে তৈরি হতো, তবে ওজন ৭০ থেকে ৮০ কেজির বেশি হতো, যা বহন করা অসম্ভব ছিল। ট্রফির নিচের অংশে দুটি সবুজ ম্যালাকাইট পাথরের স্তর রয়েছে যা এর সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয়।
বিশ্বকাপ ট্রফি তৈরির প্রক্রিয়া অত্যন্ত গোপনীয় ও সূক্ষ্ম। প্রথমে মোমের মডেলে ছাঁচ তৈরি করে তাতে ধাতু ঢালাই করা হয়, এরপর নিখুঁতভাবে পালিশ ও সোনা দিয়ে প্রলেপ দেওয়া হয়। ট্রফির প্রকৃত মূল্য কেবল সোনার ওপর নির্ভর করে না; তবে ক্রীড়া ইতিহাসবিদ ও নিলাম বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি কখনো এটি বৈধভাবে নিলামে তোলা হতো, তাহলে এর মূল্য দুই থেকে আড়াই কোটি মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ কোটি টাকা বা তারও বেশি) ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে ফিফা কখনোই ট্রফিটি বিক্রি করে না। ফাইনাল ম্যাচে অধিনায়ক যে ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরেন সেটিই আসল ট্রফি, কিন্তু আনুষ্ঠানিকতা শেষে এটি ফিফার কাছেই ফেরত দিতে হয়। বিজয়ী দলকে পরে আসল ট্রফির একটি স্বর্ণমণ্ডিত প্রতিরূপ দেওয়া হয়।
বিশ্বকাপে ব্যক্তিগত পুরস্কারের ধরনেও বিবর্তন এসেছে। সেরা খেলোয়াড়কে ‘গোল্ডেন বল’, সর্বোচ্চ গোলদাতাকে ‘গোল্ডেন বুট’, সেরা গোলরক্ষককে ‘গোল্ডেন গ্লাভস’, তরুণ খেলোয়াড়কে সেরা উদীয়মান পুরস্কার এবং দলকে ‘ফেয়ার প্লে পুরস্কার’ দেওয়া হয়। এসব পুরস্কারের অধিকাংশ ব্রাস বা ব্রোঞ্জের ওপর সোনার প্রলেপযুক্ত। এছাড়া বিশ্বকাপ ট্রফি অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তায় রাখা হয় এবং ফিফার অনুমতি ছাড়া এটি স্পর্শ করার সুযোগ নেই। এই ট্রফি কেবল একটি ধাতব বস্তু নয়, বরং কোটি কোটি মানুষের আবেগ ও ফুটবল শ্রেষ্ঠত্বের এক অনন্য উত্তরাধিকার।