পুঁজিবাজারের বড় ধরনের পতন ঠেকাতে সরকারের দেওয়া ১ হাজার কোটি টাকা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বিনিয়োগ করেছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)। বাজারের চলমান অস্থিরতা, নিজস্ব আর্থিক সংকট ও অতীতের লোকসানের বিষয়টি মাথায় রেখে প্রতিষ্ঠানটি একবারে সব অর্থ বাজারে না ঢেলে ধাপে ধাপে ‘এ’ ক্যাটাগরির শেয়ারে তা বিনিয়োগ করেছে। সম্প্রতি এই ঋণের পুরো অর্থ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ সম্পন্ন হওয়ার বিষয়টি অর্থ বিভাগকে চিঠির মাধ্যমে জানিয়েছে আইসিবি। একই সঙ্গে এই অর্থ ব্যবহারের হিসাবের চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের নিরীক্ষাও (অডিট) শেষ হয়েছে।
অর্থ বিভাগে পাঠানো আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সই করা চিঠিতে জানানো হয়েছে, বাজার পরিস্থিতি ও বিনিয়োগের ঝুঁকি বিবেচনা করার কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুরো অর্থ খাটানো সম্ভব হয়নি। তবে পরবর্তীতে অতিরিক্ত সময় পাওয়ায় অবশিষ্ট অর্থও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা হয়েছে। দেশের অন্যতম বৃহৎ এই প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানটি কেবল শেয়ার কেনাবেচাতেই সীমাবদ্ধ নয়; তারা প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি বাজারে বিনিয়োগ, পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনা, মিউচুয়াল ও ইউনিট ফান্ড পরিচালনা, প্লেসমেন্ট ও ইক্যুইটি অংশগ্রহণ এবং মার্জিন ঋণ বিতরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমও পরিচালনা করে থাকে।
পুঁজিবাজারে বিশেষ পরিস্থিতিতে আইসিবি বড় ক্রেতা হিসেবে ভূমিকা রাখে, যা ভালো মানের শেয়ারের বিক্রির চাপ কমাতে সাহায্য করে। এর ফলে বাজারে তারল্য বাড়ে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসে। তবে এর একটি নেতিবাচক দিকও রয়েছে; বাজার যদি পড়ে যায়, তবে আইসিবির নিজস্ব পোর্টফোলিওর মূল্য কমে গিয়ে বড় ধরনের কাগুজে লোকসান তৈরি হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঠিক এই পরিস্থিতিরই মুখোমুখি হতে হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিকে।
আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আইসিবি রেকর্ড ১ হাজার ২১৪ কোটি টাকা নিট লোকসান করেছে। এরপর ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (মার্চ পর্যন্ত) আরও প্রায় ৫৮৮ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিকে। এর ফলে আইসিবির সঞ্চিত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬০৯ কোটি টাকায়। এই তীব্র আর্থিক সংকট কাটাতে এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির বিপরীতে আইসিবিকে ৩ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল। সেই ঋণের ২ হাজার কোটি টাকা দিয়ে উচ্চ সুদের পুরোনো ঋণ পরিশোধ করায় প্রতিষ্ঠানটির সুদ ব্যয় প্রায় ৪৬৫ কোটি টাকা কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া ঋণের বাকি ১ হাজার কোটি টাকা এবং পরবর্তীতে সরকারের দেওয়া ১ হাজার কোটি টাকা—এই দুই তহবিলই বিশেষ নজরদারির আওতায় মূলত ‘এ’ ক্যাটাগরির সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করেছে আইসিবি। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের ৩ হাজার কোটি টাকার ঋণের মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। আইসিবির পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, এখনই এই ঋণ পরিশোধ করতে গেলে বাজারে বিপুল পরিমাণ শেয়ার বিক্রি করতে হবে, যা নতুন করে বিক্রির চাপ তৈরি করে বাজার পরিস্থিতি আরও নাজুক করে তুলতে পারে। তাই বর্তমানে দুর্বল বা অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানি এড়িয়ে তুলনামূলক ভালো আর্থিক ভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিতে বিনিয়োগের কৌশল নিয়েছে আইসিবি।
এ বিষয়ে আইসিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ জানান, বাজারকে স্থিতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব করতে সাময়িক কোনো পদক্ষেপই যথেষ্ট নয়, বরং এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সংস্কার প্রয়োজন। নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীনতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে বাজারে কারসাজি ও অনিয়ম বাড়তেই থাকবে। তিনি শক্তিশালী মৌলভিত্তির কোম্পানির সংখ্যা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে বলেন, আইসিবির বর্তমান ভূমিকা ‘যেকোনো শেয়ার কিনে বাজার ধরে রাখা’ নয়, বরং ঝুঁকি পর্যালোচনা করে নির্বাচিত শেয়ারে বিনিয়োগের মাধ্যমে বাজারে আস্থা ও তারল্য বজায় রাখা।
এদিকে পুঁজিবাজারে বেশ কিছু কারসাজিচক্র এখনো সক্রিয় রয়েছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাম্প্রতিক তদন্তে উঠে এসেছে যে, কম শেয়ার রয়েছে এমন কোম্পানিতে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করে দর বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। একটি চক্র সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রলুব্ধ করতে গুজব ছড়াচ্ছে এবং শেয়ারের দাম ও লেনদেনে অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘড়াচ্ছে। বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, এই ধরনের জুয়াড়ি চক্র সক্রিয় থাকলে সরকারি তহবিলের সঠিক সুফল পাওয়া যাবে না। কারণ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা যখন ভালো শেয়ারে বিনিয়োগ করবে, তখনো কারসাজির মাধ্যমে দুর্বল কোম্পানির শেয়ারের দর বাড়িয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকিতে ফেলা হতে পারে। এ কারণেই আইসিবিকে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হতে হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন মন্তব্য করেছেন, পুঁজিবাজারের মূল সমস্যা কেবল তারল্যের অভাব নয়, বরং এটি একটি কাঠামোগত সংকট। নিম্নমানের আইপিও অনুমোদন, আর্থিক প্রতিবেদনে কারসাজি, বিও হিসাবের অস্বচ্ছতা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের প্রশ্নবিদ্ধ আচরণ এবং সেকেন্ডারি মার্কেটে জালিকয়াতির মতো বড় বড় সমস্যা এখানে বিদ্যমান। দুর্বল নজরদারি ও অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দেওয়ার কারণে সাধারণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
পুঁজিবাজারের সার্বিক পরিস্থিতি এখনো বেশ নাজুক। গত আগস্ট মাসে ডিএসইএক্স সূচক প্রায় ৫ শতাংশ কমে ৫ হাজার ৫৯৮ পয়েন্টে নেমে এসেছিল। সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেলেও বাজার এখনো অস্থির। ৩ সেপ্টেম্বর ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৭২০ কোটি ৯২ লাখ টাকা এবং সপ্তাহ শেষে সূচক দাঁড়ায় ৫ হাজার ৬৬২ পয়েন্টে। সংশ্লিষ্টদের মতে, কেবল সরকারের ১ হাজার কোটি টাকা বা আইসিবির নিজস্ব বিনিয়োগ দিয়ে বাজারের এই কাঠামোগত সংকট দূর করা সম্ভব নয়। বাজারকে স্থিতিশীল করতে হলে ভালো কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করা, কারসাজি বন্ধ করা, আর্থিক প্রতিবেদনের স্বচ্ছতা আনা এবং কঠোর নজরদারির মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনাই হবে মূল সমাধান।