রাজধানী ঢাকায় চিহ্নিত চাঁদাবাজরা বর্তমানে অত্যন্ত বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। নগরীর প্রায় প্রতিটি থানায় চাঁদাবাজির অভিযোগ আসছে এবং ভুক্তভোগীরা নিয়মিত মামলাও করছেন। পুলিশি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ঢাকার বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া চাঁদাবাজির মামলার প্রায় ৮৫ শতাংশেরই সত্যতা পাওয়া গেছে এবং এসব মামলায় পুলিশ চার্জশিটও জমা দিয়েছে। তবে চার্জশিট দেয়ার পর বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও অনেক মামলার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে না। সম্প্রতি ঢাকার ৫০টি থানার চাঁদাবাজি ও দখলসংক্রান্ত মামলার তথ্য বিশ্লেষণে এই চিত্র ফুটে উঠেছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বর্তমানে রাজধানীতে প্রায় ১২৮০ জন চিহ্নিত চাঁদাবাজ সক্রিয় রয়েছে, যার মধ্যে ১৪৮ জন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে মহানগরের ৫০টি থানার মধ্যে ৪৯টিতেই মোট ৭২৩টি চাঁদাবাজির মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৪২৫টি মামলার তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছে এবং প্রায় ৪১ শতাংশ মামলা এখনো তদন্তাধীন। গত ২০ মাসে মোট ৩৬৫টি মামলার চার্জশিট দেয়া হয়েছে, যার ৮৫ শতাংশেই আসামিদের অভিযুক্ত করা হয়েছে এবং ১৫ শতাংশ মামলায় অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি।
বর্তমানে ফুটপাথ থেকে শুরু করে হাসপাতাল, বাড়ির মালিক, মুদির দোকান, কলকারখানা, অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শপিংমলে চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে। তবে প্রাণনাশের আশঙ্কায় বেশির ভাগ ভুক্তভোগীই থানায় মামলা করতে সাহস পান না। যারা মামলা করছেন, তারাও বিচারিক দীর্ঘসূত্রতায় ভুগছেন। অনেক ক্ষেত্রে চার্জশিট জমা হওয়ার আগেই আসামিরা জামিনে বেরিয়ে যাচ্ছে কিংবা উচ্চ আদালতে মামলা স্থগিত হয়ে যাচ্ছে। গোয়েন্দা সূত্রগুলোর মতে, এসব চাঁদাবাজির নেপথ্যে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে এবং এলাকাভিত্তিক রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে তারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। চিহ্নিত চাঁদাবাজরা এখন সরাসরি সামনে না এসে কিশোর গ্যাং সদস্যদের মাধ্যমে অপরাধ পরিচালনা করছে। আইনের ফাঁকফোকরে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত অপরাধীরা শিশু হিসেবে গণ্য হওয়ায় তারা সহজে পার পেয়ে যাচ্ছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, বিদ্যমান আইনে শিশুর বয়স ১৮ বছর নির্ধারণ করা থাকলেও এই বয়সের কিশোররা পুরোপুরি পরিণত। অপরাধীরা এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে আদালতে জামিন নিয়ে নিচ্ছে। তিনি শিশু আইনে বয়স কমিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছেন।
কয়েক মাস আগে ডিএমপি, ডিবি, এসবি ও ডিএমপি কমিশনারের গোয়েন্দা ইউনিট মিলে চাঁদাবাজ ও তাদের ৩১৪ জন আশ্রয়দাতার তালিকা তৈরি করেছে। পুলিশের তালিকা অনুযায়ী, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় গুলশান, বাড্ডা ও রামপুরা এলাকা। গুলশান, মহাখালী, বাড্ডা, রামপুরা ও মগবাজার এলাকায় জিসান গ্রুপের আধিপত্য বেশি। জিসান বিদেশে বসে অপরাধ চক্র নিয়ন্ত্রণ করছে। এছাড়া মেহেদী বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছে। বাড্ডার রবিন-ডালিম-মাহবুব গ্রুপ মালয়েশিয়ায় থেকে তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। সুব্রত বাইন, চঞ্চলসহ আরও অনেক সন্ত্রাসী বিদেশ থেকে চাঁদাবাজি ও দখলবাজি পরিচালনা করছে। পুলিশের তালিকায় ডেমরা, শ্যামপুর, ওয়ারী, কদমতলী, কামরাঙ্গীরচর, চকবাজার, সবুজবাগ, খিলগাঁও ও পল্টনসহ বিভিন্ন থানায় সক্রিয় অস্ত্রধারী চাঁদাবাজদের নাম রয়েছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, পুলিশ তালিকা তৈরি করলেও অপরাধের সুবিধাভোগীদের তালিকা না হওয়া এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।