দেশে কোনো চাঞ্চল্যকর বা সংবেদনশীল ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় হয়ে উঠছে অপতথ্য উৎপাদনকারী চক্র। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তৈরি করা এসব বিভ্রান্তিকর বয়ান দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে ফেসবুক রিলস, ইউটিউব ভিডিও কিংবা ফটোকার্ডের মাধ্যমে। সাধারণ মানুষ সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের আগেই এগুলো বিশ্বাস করে ফেলছেন এবং সেখান থেকে একপর্যায়ে নেতিবাচক জনমত তৈরি হচ্ছে। অথচ এই পুরো প্রক্রিয়ায় সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো এক প্রকার দর্শকের ভূমিকায় থাকছে, যার ফলে তথ্যযুদ্ধে বারবার পিছিয়ে পড়ছে রাষ্ট্র।
অতি সম্প্রতি কুমিল্লায় কিশোর অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডকে সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়ার চেষ্টা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী মধুর ক্যান্টিনকে নবাব পরিবারের ‘ইশারাত মঞ্জিল’ দাবি করা, কিংবা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিউইয়র্ক সফর নিয়ে visa নিষেধাজ্ঞার অপপ্রচারকে সাম্প্রতিক তথ্যযুদ্ধের মারাত্মক উদাহরণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। কুমিল্লার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর তাকে হিন্দু পরিচয় দিয়ে সাম্প্রদায়িক উসকানি ছড়ানোর চেষ্টা করা হলেও পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে, মূলত আইফোন ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যেই তাকে হত্যা করা হয়েছিল। একইভাবে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফর নিয়ে কয়েকজন ইউটিউবার দাবি করেন, তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অথচ প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের বিভিন্ন কর্মসূচি ও মার্কিন প্রেসিডেন্টের নৈশভোজসহ নানা আয়োজনে অংশ নেন। সরকারের দিক থেকে দ্রুত কোনো সত্য তথ্য বা ‘কাউন্টার ন্যারেটিভ’ না আসায় এই গুজবগুলো সহজেই ডালপালা মেলেছে।
বিভ্রান্তিকর প্রচারণার তালিকায় আরও রয়েছে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের ‘ঢাকা লকডাউন’ কর্মসূচিকে ঘিরে পুরোনো ভিডিওর ব্যবহার। ২০ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচি ঘিরে অন্তত ১১টি পুরোনো ভিডিও ছড়ানো হয়, যার একটি ছিল ২০২১ সালে ফেনীতে যুবলীগের একটি মিছিলের। এছাড়া, গত ১৯ সেপ্টেম্বর রাজধানীতে তিনটি বাসে আগুনের ঘটনায় জামায়াত নেতাসহ তিনজনকে আটকের একটি ভুয়া ফটোকার্ড বাংলাভিশনের লোগো ব্যবহার করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এমনকি ভাটারা থানায় ন্যায্য ভাড়া চাওয়ায় এক সিএনজিচালককে মারধরের একটি ভিডিওর তরুণীকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, যা পরবর্তীতে ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে সরকারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো দ্রুত ও সমন্বিত তথ্য সরবরাহের ঘাটতি। ডিজিটাল ফরেনসিকexpert তানভীর হাসান জোহা জানান, কোনো ঘটনার প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থা যদি যাচাই করা সত্য তথ্য প্রকাশ না করে, তবে সেই শূন্যস্থানটি অনুমান, গুজব ও রাজনৈতিক অপব্যাখ্যা দিয়ে পূরণ হয়ে যায়। তিনি সরকারকে একটি ডেডিকেটেড ফ্যাক্ট-চেকিং প্ল্যাটফর্ম তৈরির পরামর্শ দেন, যেখানে প্রযুক্তি ও মেশিন লার্নিংয়ের সহায়তায় সত্য-মিথ্যার ব্যাখ্যা দ্রুত মানুষের সামনে তুলে ধরা সম্ভব হবে।
ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশে ৩ হাজার ২১০টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি টার্গেট করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে। ডিসমিসল্যাবের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এপ্রিল-জুন সময়ে যাচাই করা ১ হাজার ২৬৫টি অপতথ্যের মধ্যে ৫৭ শতাংশই ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এছাড়া ধর্মীয় অপতথ্যের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ শতাংশে এবং আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত অপতথ্য ছিল ৮.২ শতাংশ। গুজব ও প্রোপাগান্ডা বিশেষজ্ঞ ইমতিয়াজ মির্জা বলেন, যেকোনো ঘটনার প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তথ্য না দিলে সাধারণ ব্যবহারকারীরাই নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা তৈরি করে নেয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, অসত্যের জবাব দিতে হবে তথ্য ও যুক্তি দিয়ে, মানুষের কণ্ঠরোধ করে নয়।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সামাজিক মাধ্যমে অপতথ্য ছড়ানোর পেছনে একটি সুসংগঠিত চার স্তরের নেটওয়ার্ক কাজ করে। প্রথম স্তরে থাকে উৎস বা বয়ান উৎপাদক, যারা মূলত রাজনৈতিক কর্মী বা অজ্ঞাত অ্যাকাউন্ট। দ্বিতীয় স্তরে থাকে বড় পেজ, ইউটিউবার ও ইনফ্লুয়েন্সাররা, যারা এই মিথ্যা তথ্যকে বিশাল দর্শকের কাছে পৌঁছে দেয়। তৃতীয় স্তরে রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক এটিকে রাজনৈতিক রূপ দেয় এবং চতুর্থ স্তরে রিলস, মিম ও ফটোকার্ড তৈরি করা হয়। সবশেষে মূলধারার গণমাধ্যম বা টকশোতে যাচাই ছাড়া এগুলো আলোচনায় এলে তা সমাজে ‘প্রতিষ্ঠিত সত্য’ হিসেবে জায়গা করে নেয়।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী জানান, সরকার কারও মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে চায় না। তবে ভুল তথ্য ও অপতথ্যের বিস্তার রোধে সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য ও হয়রানি ঠেকাতে একটি ইতিবাচক অগ্রগতির কথা জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। তিনি জানান, সম্প্রতি মেটার (ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মূল প্রতিষ্ঠান) সঙ্গে সরকারের একটি বৈঠকে মেটা ঢাকায় তাদের অফিস স্থাপনে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ঢাকায় মেটার অফিস থাকলে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সরাসরি যোগাযোগ করে অপতথ্য ও আপত্তিকর কনটেন্ট দ্রুত অপসারণ করতে পারবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।