ইউরোপে পাড়ি জমালেই জীবন বদলে যাবে—এমন প্রলোভনে পড়ে প্রতি বছর অসংখ্য বাংলাদেশি তরুণ-তরুণী ও তাদের পরিবার সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। দালাল চক্রের দেখানো ভালো চাকরি, মোটা অঙ্কের বেতন ও বৈধ কাগজপত্রের রঙিন স্বপ্ন অনেকের জীবনের জন্য ডেকে আনছে চরম অনিশ্চয়তা। ঋণগ্রস্ততা, ভুয়া ভিসা, মানবপাচার ও বন্দিদশার মতো কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাঁদের। ইউরোপে অবস্থানরত একাধিক ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে এই নির্মম চিত্র। নিরাপত্তার স্বার্থে প্রতিবেদনে তাঁদের ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে।
সিলেটের এক দম্পতি সামিয়া আশরাফ ও তাঁর স্বামী প্রথমে ছাত্র ভিসায় যুক্তরাজ্যে যান। সেখানে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তাঁরা ফ্রান্সে চলে আসেন। সেখানে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করলেও তা সফল হয়নি। পরবর্তীতে পর্তুগাল ও স্পেনে বৈধতা পাওয়ার আশায় বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে চেষ্টা চালান। কিন্তু পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ও পাসপোর্টের নামের বানানসহ নানা জটিলতায় বারবার ব্যর্থ হন তাঁরা। এই প্রক্রিয়ায় তাঁদের কয়েক লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।
প্রায় একই ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন মৌলভীবাজারের দম্পতি সিনথিয়া ইসলাম ও রোমানা আহমেদ। এক দেশ থেকে অন্য দেশে বৈধ হওয়ার আশায় ঘুরতে গিয়ে প্রতিবারই তাঁদের নতুন নিয়ম, নতুন কাগজপত্র এবং নতুন খরচের মুখোমুখি হতে হয়েছে। খরচ মেটাতে দেশে থাকা পরিবারের কাছ থেকে বারবার টাকা নিতে হয়েছে, যার ফলে তাঁদের সঞ্চয় শেষ হয়ে ঋণের বোঝা বেড়েই চলেছে।
সুনামগঞ্জের দম্পতি ইদ্রিস মিয়া ও শান্তা ইসলাম জানান, ইউরোপে এসে নিয়মিত কাজ পাওয়াই এখন সবচেয়ে বড় সংকট। একদিন কাজ থাকলে পরের দিন থাকে না। অথচ প্রতি মাসে বাসাভাড়া, খাবার ও যাতায়াত খরচ ঠিকই গুণতে হয়। দেশে থাকা পরিবার মনে করে তাঁরা খুব ভালো আছেন, কিন্তু বাস্তবে নিজেদের খরচ চালানোই কঠিন হয়ে পড়ে। কাগজপত্র না থাকায় অনেকেই ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন গ্রুপে রেস্টুরেন্ট, পরিচ্ছন্নতা, নির্মাণ বা খাবার সরবরাহের কাজের সন্ধান করেন। বাধ্য হয়ে অত্যন্ত কম পারিশ্রমিকে কাজ করতে হয় তাঁদের। কেউ রেস্টুরেন্টের রান্নাঘরে বাসন ধোয়ার কাজ করেন, কেউ প্রচণ্ড ঠান্ডায় খাবার সরবরাহ করেন, আবার কেউবা নির্মাণকাজে কঠোর পরিশ্রম করেন। বৈধ শ্রমিকদের চেয়ে অনেক কম টাকা পেলেও কাজ হারানোর ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করতে পারেন না।
আবাসন সমস্যাও তাঁদের জন্য আরেকটি বড় বাধা। বৈধ কাগজপত্র না থাকায় নিজের নামে বাসা ভাড়া নেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে অন্যের বাসায় সাবলেট হিসেবে গাদাগাদি করে থাকতে হয়। ছোট একটি ঘরে একাধিক মানুষের বসবাস এবং রান্নাঘর, বাথরুম ও পানি-বিদ্যুৎ ব্যবহারের সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়েই কাটে তাঁদের দিন। নারীদের ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ। কাজের অভাব, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং অপরিচিত পরিবেশে একা হয়ে যাওয়ার কারণে অনেকেই তীব্র মানসিক চাপে ভোগেন।
তবে ইউরোপে পৌঁছানোর আগেই অনেকের ওপর নেমে আসে চরম বিপর্যয়। লিবিয়ায় বাংলাদেশিদের আটকে রেখে নির্যাতন ও মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা বারবার ঘটছে। ২০২৫ সালে দুই বাংলাদেশিকে লিবিয়ায় ৪২ দিন আটকে রেখে নির্যাতন ও মুক্তিপণ দাবির অভিযোগে বাংলাদেশে পুলিশি অভিযান চালানো হয়। ২০২৬ সালেও লিবিয়া থেকে বাংলাদেশিদের নির্যাতন ও মুক্তিপণের অভিযোগ সামনে এসেছে। এছাড়া ইতালিতে পাঠানোর নামে ভুয়া শেনজেন ভিসা দিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে এক ভুক্তভোগীর কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা অগ্রিম নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ইউরোপে যাওয়ার জন্য ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করার ঘটনাও অহরহ ঘটছে।
এত ঝুঁকি জেনেও কেন তরুণরা এভাবে বিদেশমুখী হচ্ছেন, তার পেছনে রয়েছে দেশের কর্মসংস্থানের সংকট। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে বাংলাদেশে ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও চাকরি তৈরি হয়েছে মাত্র ৮৭ লাখের। ফলে বিপুলসংখ্যক তরুণ কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং বেশি আয়ের আশায় ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিচ্ছেন। দালালরা তরুণদের এই চাহিদাকেই পুঁজি করছে।
ইউরোপে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় নিলেই বৈধ হওয়া যায়—এমন ধারণাও ভুল প্রমাণিত হচ্ছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে প্রায় ২০ হাজার বাংলাদেশি ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে আন্তর্জাতিক সুরক্ষার আবেদন করেছেন, কিন্তু দেশভেদে এই আবেদন সফল হওয়ার হার অত্যন্ত সীমিত। তাই ইউরোপের স্বপ্ন বন্ধ না করে নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসন পথ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব হলো নাগরিকদের প্রকৃত অভিবাসন ব্যয়, বৈধ নিয়োগকারী, ভিসার ধরণ ও সংশ্লিষ্ট দেশের আইন সম্পর্কে সহজ ভাষায় তথ্য দেওয়া। একই সঙ্গে স্থানীয় উপ-এজেন্টদের কঠোর নজরদারিতে আনা এবং মানবপাচার চক্রকে নেটওয়ার্কসহ তদন্ত করা জরুরি। সর্বোপরি, দেশে তরুণদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে।