বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, লিঙ্গ সমতা ও শিশু অধিকার রক্ষায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কার ২০২৬-এর জন্য প্রাথমিকভাবে মনোনীত হয়েছেন জামালপুরের মেয়ে কাশফিয়া জান্নাত কুহু। নেদারল্যান্ডসভিত্তিক শিশু অধিকার সংস্থা ‘কিডস রাইটস’ প্রতিবছর এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের আয়োজন করে, যা বিশ্বজুড়ে ‘শিশুদের নোবেল’ হিসেবে পরিচিত।
কাশফিয়া জান্নাত কুহু জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলার কড়ইচুড়া ইউনিয়নের মোমেনাবাদ গ্রামের সন্তান। তার বাবা কাইয়ুম হিলালী মাইকেল ও মা শিউলী খাতুন পেশায় শিক্ষক দম্পতি। পড়াশোনার কারণে কাশফিয়া ঢাকায় অবস্থান করলেও নিজের এলাকার মাটি ও মানুষের সঙ্গে তার যোগাযোগ অত্যন্ত নিবিড়। গ্রামে বেড়ে ওঠার সময়েই সে কাছ থেকে দেখেছে কীভাবে মেয়েরা বাল্যবিয়ের শিকার হয় এবং লিঙ্গ বৈষম্যের কারণে অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। এই অভিজ্ঞতাগুলোই তাকে শিশু অধিকার ও লিঙ্গ সমতা নিয়ে কাজ করতে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে।
কিডস রাইটসের তথ্য অনুযায়ী, বিগত এক বছরে কাশফিয়া ব্যক্তিগত উদ্যোগে বেশ কয়েকটি বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া অনেক শিশুকে পুনরায় শিক্ষার আলোয় ফিরিয়ে আনতে সে কাজ করেছে। লিঙ্গ সমতা নিয়ে গ্রামীণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে সে নিয়মিত উঠান বৈঠক ও স্থানীয় সেমিনারের আয়োজন করে আসছে। এর বাইরে জলবায়ু ন্যায়বিচার ও পরিবেশ সুরক্ষায়ও বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে সে।
সামাজিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি কাশফিয়া একজন শিশু সাংবাদিক হিসেবেও সক্রিয়। সে শিশু সাংবাদিকতায় বিশ্বের প্রথম বাংলা সাইট ‘হ্যালো ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম’-এ নিয়মিত লিখছে। তার প্রতিবেদনে বাল্যবিয়ের ক্ষতিকর প্রভাব, শিশুদের অধিকার এবং সামাজিক বৈষম্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের একটি প্রতিবেদনে সে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে আইনের যথাযথ প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে। উল্লেখ্য, এটি কাশফিয়ার প্রথম মনোনয়ন নয়; গ্রামীণ এলাকায় বাল্যবিয়ে রোধ ও লিঙ্গ সমতা প্রতিষ্ঠায় কাজের জন্য সে ২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কারের জন্যও মনোনীত হয়েছিল।
কাশফিয়ার বড় বোন কারিমা ফেরদৌসী কেকাও শিশু অধিকার, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, লিঙ্গ সমতা ও জলবায়ু সচেতনতা নিয়ে কাজ করছেন। এই দুই বোনের সামাজিক উদ্যোগের কারণে মাদারগঞ্জ উপজেলাটি আগেই আন্তর্জাতিক মহলে পরিচিতি লাভ করেছিল। মাদারগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে এসে কাশফিয়ার এই ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।
২০২৬ সালের এই পুরস্কারের জন্য বিশ্বজুড়ে প্রাথমিকভাবে ২৯৮ জন শিশুকে মনোনীত করা হয়েছে, যার মধ্যে বাংলাদেশ থেকে স্থান পেয়েছে ৪২ জন। বাংলাদেশ থেকে মনোনীতদের তালিকায় কাশফিয়া ছাড়াও ‘হ্যালো’-র আরও sechsজন শিশু সাংবাদিক রয়েছেন। তারা হলেন—অরণ্য আবীর খান প্রাপ্য, ফারাবি জাবিন সায়েরী, জয়া বণিক, সুদীপ্ত দেবনাথ, মুশফিকুর রহমান ও জামিউল হাসান আরাফ।
২০০৫ সালে চালু হওয়া এই আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কার প্রতিবছর এমন একজন তরুণকে দেওয়া হয়, যিনি শিশুদের অধিকার রক্ষায় অনন্য অবদান রেখেছেন। প্রথা অনুযায়ী, একজন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী এই সম্মাননাটি বিজয়ীর হাতে তুলে দেন। এর আগে ২০২০ সালে সাইবার বুলিং থেকে শিশুদের সুরক্ষায় কাজ করে বাংলাদেশের নড়াইলের সাদাত রহমান এই পুরস্কার অর্জন করেছিলেন, যিনি নিজেও একসময় হ্যালোর শিশু সাংবাদিক ছিলেন।
শিশু সাংবাদিকতায় বিশ্বের প্রথম বাংলা সাইট হ্যালো ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ৭ শিশু সাংবাদিকের মধ্যে কাশফিয়া জান্নাত কুহুও রয়েছে।
২০২৬ সালের এই পুরস্কারের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রাথমিকভাবে ২শ ৯৮জনকে মনোনয়ন দেয়া হয়।