বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের সংঘাত ও বৈরিতার অবসানে ‘রিকনসিলিয়েশন’ বা রাজনৈতিক পুনর্মিলনের বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার স্বার্থে এই প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হলেও, বর্তমান বাস্তবতায় তা কতখানি সম্ভব—তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক মতভেদ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে অপরাধের দায় স্বীকার না করা, অনুতপ্ত না হওয়া এবং উল্টো হুমকি-ধমকি দেওয়ার প্রবণতাকে এই পথের বড় অন্তরায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ্ চৌধুরী মনে করেন, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তির সঙ্গে পতিত স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সমঝোতার কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে দলটি যদি নিজেদের ভুল ও অপরাধ স্বীকার করে জনগণের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চায়, তাহলে গুরুতর অপরাধে সরাসরি জড়িত নয় এমন নেতাকর্মীদের রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। যদিও এখন পর্যন্ত তাদের মধ্যে কোনো অনুশোচনা বা ক্ষমা চাওয়ার লক্ষণ দেখা যায়নি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার রিকনসিলিয়েশনের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, একটি বিভক্ত জাতি পরস্পরের সঙ্গে দ্বন্দ্বে লিপ্ত থেকে বেশি দূর এগোতে পারে না। দেশকে একটি शासनযোগ্য রাষ্ট্রে পরিণত করতে পুনর্মিলনের কোনো বিকল্প নেই। তবে এটি তখনই সম্ভব হয়, যখন সব পক্ষ খোলামনে এগিয়ে আসে এবং নিজেদের অতীত ভুলত্রুটি স্বীকার করে ভবিষ্যতে তার পুনরাবৃত্তি না করার অঙ্গীকার করে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এখনো প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের আস্ফালন দেখা যাচ্ছে, যা সমঝোতার পরিবেশ নষ্ট করছে।
লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজের মতে, বাংলাদেশের জন্য রিকনসিলিয়েশন অত্যন্ত কঠিন হলেও এটি অপরিহার্য। প্রতিশোধের চক্রে আটকে থাকলে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব নয়। তিনি মনে করেন, আওয়ামী লীগ ভুল স্বীকার না করে বড় ভুল করছে। তবে বিজয়ী পক্ষ হিসেবে সরকারেরও একটি প্রক্রিয়া শুরু করার দায়িত্ব রয়েছে, যা রাষ্ট্রপতি বা সংসদের উদ্যোগের মাধ্যমে শুরু হতে পারে।
সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬’-এ বিষয়টি নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়। সেখানে বক্তারা স্পষ্ট করেন যে, যৌথ তদন্ত, ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ এবং অপরাধীদের শাস্তি ও অনুশোচনা ছাড়া পুনর্মিলন সম্ভব নয়। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল ওই অনুষ্ঠানে বলেন, আগে ফ্যাসিস্টদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে, এরপরই রিকনসিলিয়েশনের প্রশ্ন আসবে। অপরাধীদের আইনি বিচার থেকে আড়াল করার চেষ্টা বিশ্বজুড়েই এই প্রক্রিয়াকে ব্যর্থ করেছে।
এই আলোচনায় বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতাও উঠে আসছে। দক্ষিণ আফ্রিকার ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ নেলসন ম্যান্ডেলার নেতৃত্বে সত্য প্রকাশ ও জবাবদিহির মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিল। এছাড়া রুয়ান্ডায় ১৯৯৪ সালের গণহত্যার পর দেশীয় গাকাকা আদালত ও আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচার ও পুনর্মিলন সমান্তরালে চলেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নুরেমবার্গ ট্রায়ালের মাধ্যমে নাৎসিদের বিচারও একটি বড় উদাহরণ। সিয়েরা লিওন, ঘানা, কেনিয়া, নেপাল ও শ্রীলঙ্কাসহ প্রায় ৪০টি দেশে এমন কমিশন গঠিত হলেও একেক দেশের অভিজ্ঞতা ছিল ভিন্ন।
সরকারের অবস্থান নিয়ে পিআইডির এক সংবাদ সম্মেলনে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানান, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অনবরত হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে সরকারের পক্ষ থেকে রিকনসিলিয়েশনের আলাপ করা অত্যন্ত কঠিন। তাছাড়া আওয়ামী লীগ নিজেই এই প্রক্রিয়া চাচ্ছে না; রিকনসিলিয়েশন চাইলে প্রথমে তাদেরই এগিয়ে আসতে হবে এবং মৌলিক শর্তগুলো পূরণ করতে হবে।
দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও এ নিয়ে ভিন্ন অবস্থান রয়েছে। বিএনপির ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবে ‘ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ এবং জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী ইশতেহারে ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’ গঠনের প্রতিশ্রুতি ছিল। তবে জামায়াত ও এনসিপি বর্তমানে এর ঘোর বিরোধী। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, গণহত্যা পরিচালনাকারীরা অনুতপ্ত না হলে এবং আইনের মুখোমুখি না হয়ে বিদেশ থেকে ষড়যন্ত্র করলে জনগণ তা মেনে নেবে না। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও একই সুরে বলেন, অপরাধের জন্য আওয়ামী লীগ ক্ষমা না চাওয়ায় এ বিষয়ে আলোচনার কোনো সুযোগ নেই।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন মনে করেন, অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি দল হিসেবে আওয়ামী লীগের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তবে তৃণমূলের যেসব নেতাকর্মী হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না, তারা যদি জুলাই অভ্যুত্থানকে স্বীকার করে নেন, তবে তাদের জন্য সুযোগ থাকা উচিত। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলও একটি ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছিলেন, যা ১৯৭২ সাল থেকেই থাকা উচিত ছিল বলে তিনি মনে করেন। তবে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকেরা এখনো অতীত কর্মকাণ্ডের দায় স্বীকার করা থেকে বিরত রয়েছেন।