রান্নার কাজে বহুল ব্যবহৃত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কাছে একরকম জিম্মি হয়ে পড়েছে বাজার ব্যবস্থা। ব্যবসায়ীদের চাপের মুখে বর্তমান সরকারের সাড়ে সাত মাসে অত্যাবশ্যকীয় এই জ্বালানির দাম প্রায় ৩৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এরপরও সরকার নির্ধারিত দামে দেশের কোথাও গ্যাস মিলছে না। ভোক্তাদের প্রতিটি সিলিন্ডার কিনতে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অতিরিক্ত ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে।
সম্প্রতি ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম দফায় দফায় বাড়িয়ে ১,৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হলেও খুচরা বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ২,২০০ থেকে ২,৩০০ টাকায়। সরকারি তদারকি প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা এই অতিরিক্ত মুনাফা লুটে নিচ্ছেন, যার ফলে সাধারণ ভোক্তাদের দৈনিক ব্যয় ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। বর্তমানে দেশে এলপিজির গ্রাহকসংখ্যা এক কোটির বেশি। পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহের তীব্র সংকটের কারণে বিশাল এই জনগোষ্ঠী বাধ্য হয়ে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন এবং অতিরিক্ত দামের বোঝা বইছেন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। এলপিজি আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) সক্ষমতা নিয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। বেসরকারি আমদানিকারকরা যেখানে প্রতি টন এলপিজি প্রায় ২০০ ডলারে আমদানি করছে, সেখানে বিপিসির ক্ষেত্রে দর চাওয়া হচ্ছে ২৭০ ডলার।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খুচরা বিক্রেতারা চাহিদামতো গ্যাস পাচ্ছেন না বলে দাবি করছেন। তারা বলছেন, কোম্পানিগুলো ঠিকমতো সরবরাহ না করায় তারা বিকল্প পথ ধরে বাড়তি দামে সিলিন্ডার কিনছেন এবং সামান্য লাভে তা বিক্রি করছেন। তবে খুচরা বিক্রেতাদের এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পাইকারি ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, খুচরা বিক্রেতাদের কাছে আগের মজুত থাকায় তারা নতুন করে গ্যাস নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। অন্যদিকে, ডিলার ও ডিস্ট্রিবিউটরদের অভিযোগ—অপারেটররা চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার সরবরাহ করছেন না। সরবরাহ সচল রাখতে বড় ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কেউ মুখ খুলতে চাচ্ছেন না।
বাংলাদেশ এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের (লোয়াব) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক অবশ্য দাবি করেছেন, দেশে পর্যাপ্ত এলপিজি মজুত রয়েছে। সরবরাহ কমার সুযোগ নিয়ে ডিস্ট্রিবিউটর, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের একাংশ সিলিন্ডার মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। কোনো অপারেটর বেশি দামে বিক্রি করছে—এমন সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি), প্রতিযোগিতা কমিশন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও বিএসটিআইয়ের মতো সংস্থাগুলোকে মাঠ পর্যায়ে কার্যকর নজরদারি করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
জ্বালানি বিশেজ্ঞ এম শামসুল আলম অভিযোগ করেন, বিইআরসি মূলত ব্যবসায়ীদের বাড়তি মুনাফা করার সুযোগ করে দিচ্ছে। ২০২১ সালের আগে ব্যবসায়ীরা নিজেদের ইচ্ছামতো দামে এলপিজি বিক্রি করতেন। আদালতের নির্দেশে বিইআরসি দাম নির্ধারণের দায়িত্ব পেলেও ব্যবসায়ীদের চাপে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর চেয়ে বেশি দাম নির্ধারণ করে দেয় তারা, যা আবার বাজারে কার্যকরও করতে পারে না।
মূল্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, তারেক রহমানের বর্তমান সরকার চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার সময় প্রতি কেজি এলপিজির দাম ছিল ১১৩ টাকা এবং ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ছিল ১,৩৫৬ টাকা। সাড়ে সাত মাসের ব্যবধানে গত ৪ অক্টোবর প্রতি কেজির দাম নির্ধারণ করা হয় ১৫৩ টাকা, যার ফলে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম দাঁড়িয়েছে ১,৮৩৭ টাকা। মাঝে দুই দফায় দাম কমলেও সামগ্রিকভাবে এই সময়ে দাম বেড়েছে ৩৫ শতাংশ। এর আগে ২০২১ সালের এপ্রিলে বিইআরসি প্রথমবারের মতো ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৯৭৫ টাকা নির্ধারণ করেছিল। চলতি বছরের এপ্রিলে দুই দফায় মোট ৫৯৯ টাকা বাড়িয়ে দাম ১,৯৪০ টাকা করা হয়। এরপর জুনে ৫৫ টাকা এবং জুলাইয়ে ৩৫৭ টাকা কমানো হলেও আগস্টে আবার ৭০ টাকা বাড়িয়ে ১,৫৯৮ টাকা করা হয়। সেপ্টেম্বরে ১৩ টাকা কমিয়ে ১,৫৮৫ টাকা করা হলেও অক্টোবরে তা আবার বড় ব্যবধানে বাড়ানো হয়।
বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশেই এলপিজির দাম সর্বোচ্চ। বাংলাদেশে প্রতি কেজির সরকারি দাম ১৫৩ টাকা হলেও ভারতে এর ভর্তুকিমূল্য বাংলাদেশি টাকায় মাত্র ৮৭ টাকা এবং ভর্তুকি ছাড়া ১০৮ টাকা। এছাড়া পাকিস্তানে প্রতি কেজি এলপিজির দাম ১২৪.১৬ টাকা, নেপালে ১১৫.৩৫ টাকা এবং শ্রীলঙ্কায় ১১৬ টাকা। ভারতে ভর্তুকি বাদে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১,৩০০ টাকার কাছাকাছি থাকে। শ্রীলঙ্কার কলম্বোয় সাড়ে ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হয় ১,৪০০ টাকায়। পাকিস্তানে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম বাংলাদেশি মুদ্রায় দেড় হাজার টাকার কিছু কম। পাকিস্তান ও বাংলাদেশে নির্ধারিত দামের চেয়ে কিছুটা বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ থাকলেও ভারত, শ্রীলঙ্কা ও নেপালে সাধারণত সরকারি নির্ধারিত দামেই ভোক্তারা গ্যাস কিনতে পারেন।
পাকিস্তানে প্রতি কেজির দাম ২৭৯ রুপি। বাংলাদেশি মুদ্রায় ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম পড়ে দেড় হাজার টাকার কিছু কম। পাকিস্তানে এলপি গ্যাস নির্ধারিত দামের চেয়ে কিছুটা বাড়তি দামে বিক্রির অভিযোগ থাকলেও ভারত, শ্রীলঙ্কা ও নেপালে মোটামুটি সরকার নির্ধারিত দামেই বিক্রি হয় বলে জানা গেছে।