বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান-২০২৫ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী কমেছে চার লাখের বেশি। গত জুনে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে মাধ্যমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষার সম্পূরক পরিসংখ্যানও প্রকাশ করা হয়েছে। ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ে মোট শিক্ষার্থী ছিল ৮৬ লাখ ৩৮ হাজারের বেশি, যেখানে আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ৯০ লাখ ৬৩ হাজারের বেশি। অর্থাৎ এক বছরে এ স্তরে শিক্ষার্থী কমেছে চার লাখের বেশি।
ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, জুনিয়র স্কুলসহ দেশে সরকারি-বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এখন ১৯ হাজার ২১১টি। ২০২৪ সালে ১৯ হাজার ১১৭টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিল ৭৮ লাখ ৪৭ হাজার ৫৪৬ জন। অর্থাৎ এক বছরে মাধ্যমিক বিদ্যালয় বেড়েছে ৯৪টি, আর শিক্ষার্থী কমেছে ৪ লাখ ৮ হাজারের বেশি। স্কুল অ্যান্ড কলেজগুলোতেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে মাধ্যমিক স্তরসহ মোট শিক্ষার্থী এখন ১৫ লাখ ৩১ হাজারের বেশি, আগের বছর যা ছিল ১৫ লাখ ৬৪ হাজারের বেশি। অথচ প্রতিষ্ঠান বেড়ে ১ হাজার ৫১৪টি থেকে ১ হাজার ৫৫৬টি হয়েছে। স্কুল অ্যান্ড কলেজগুলোর মধ্যে শুধু মাধ্যমিক স্তরেই শিক্ষার্থী ১১ লাখ ২৮ হাজারের বেশি। এছাড়া ৫৪৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয়, যেখানে শিক্ষার্থী ৭০ হাজারের বেশি।
শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার এই প্রবণতায় শিক্ষার পরিকল্পনা ও মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড গত বছরের এসএসসি পরীক্ষায় অনুপস্থিতির কারণ অনুসন্ধানে ১ হাজার ৩৫০ জন অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীর তথ্য সংগ্রহ করেছিল। বোর্ড জানতে পারে, এসব পরীক্ষার্থীর প্রায় ৪১ শতাংশের (৫৪৯ জন) বিয়ে হয়ে গেছে, যাদের ৯৭ শতাংশই ছাত্রী। ব্যানবেইসের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই প্রতিবেদনটি তৈরি হয়েছে, তবে এখানে আলাদাভাবে কোনো কারণ বিশ্লেষণ করা হয়নি।
শিক্ষক ও শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, করোনায় শিখন ঘাটতি, সাম্প্রতিক নানা বিষয়, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ এবং পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের একাংশের শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়ে থাকতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান বলেন, মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পেছনে করোনার পর শিখন ঘাটতি, পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়া, সাম্প্রতিক নানা বিষয়, শিশুশ্রমে যুক্ত হওয়া এবং শিক্ষাক্রমের প্রভাব থাকতে পারে। তিনি মনে করেন, এই পরিসংখ্যানের প্রবণতা বুঝতে নিবিড় গবেষণা প্রয়োজন এবং গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। এর আগে করোনার সময় ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে মাধ্যমিকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৯ লাখ কমেছিল।
এদিকে, সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষায় শিক্ষার্থীর হার ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও, ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী স্বতন্ত্র কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী কমে ৬ লাখ ৫০ হাজারে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২৪ সালে ছিল ৬ লাখ ৭৬ হাজারের বেশি। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের তথ্যেও সার্বিকভাবে কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষায় বিপুলসংখ্যক আসন খালি থাকার চিত্র উঠে এসেছে।
বিপরীত চিত্র দেখা গেছে মাদ্রাসা ও ইংরেজি মাধ্যমের ক্ষেত্রে। দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল পড়ানো হয় এমন মাদ্রাসা আছে ৯ হাজার ২৯৬টি। এসব প্রতিষ্ঠানে ২০২৫ সালে শিক্ষার্থী ছিল ২৮ লাখ ৪০ হাজারের বেশি, যেখানে ২০২৪ সালে ৯ হাজার ২৬৯টি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী ছিল ২৭ লাখ ৯৬ হাজারের বেশি। অর্থাৎ এক বছরে মাদ্রাসার সংখ্যা বেড়েছে ২৭টি আর শিক্ষার্থী বেড়েছে ৪৩ হাজারের বেশি। তবে এই হিসাবে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা ও কওমি মাদ্রাসার তথ্য নেই। অন্যদিকে, দেশে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলের সংখ্যা ১৪৩টি, যেখানে শিক্ষার্থী ২৯ হাজার ৬৭২ জন। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ২৯ হাজার ৭৭ জন, অর্থাৎ এক বছরে শিক্ষার্থী বেড়েছে ৫৯৫ জন। এছাড়া ময়মনসিংহে এক বছরে প্রাথমিকে ১ লাখের বেশি শিক্ষার্থী কমেছে এবং ২১টি সরকারি স্কুলে শিক্ষার্থী ৫০ বা তার কম, শিক্ষার্থী না থাকায় একটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।