গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পর থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। ইরানের সামরিক লক্ষ্য ছিল দেশটির সক্ষমতা খর্ব করা, কিন্তু যুদ্ধের সাত মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পর দেখা যাচ্ছে, ইরান তার পাল্টা কৌশলে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল-গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানীয় জল এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে অচল করে দেওয়ার মতো সক্ষমতা অর্জন করেছে। রয়টার্সের অনুসন্ধান বলছে, এই সময়ে ইরান ও তার মিত্ররা উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর—সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, ওমান ও ইরাকের—অন্তত ৮৪টি অবকাঠামোস্থলে ১৩৫টির বেশি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
ইরানের এই কৌশল কেবল সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করা নয়, বরং অর্থনীতির প্রাণপ্রবাহকে অচল করে দেওয়া। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দর, যা হরমুজ প্রণালির বাইরে অবস্থিত হওয়ায় বিকল্প পথ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সেখানে অন্তত ১৯ বার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে। এসব হামলায় তেল সংরক্ষণাগার, পাইপলাইন এবং জাহাজে তেল তোলার গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে মার্চ মাসে ম্যাট্রিক্স ম্যানিফোল্ডের মতো জটিল সংযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মে মাসের ৪ তারিখের হামলার পর পরিশোধিত জ্বালানির রপ্তানি প্রায় এক মাসের জন্য কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। জ্বালানি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ১ জুন পর্যন্ত বন্দরটি থেকে মাত্র একটি জাহাজ পণ্য নিয়ে বের হতে পেরেছিল এবং রপ্তানি স্বাভাবিক হতে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় লেগেছে। হিউস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের পেট্রোলিয়াম প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক রামানান কৃষ্ণমূর্তির মতে, এটি ছিল কোনো ব্যবস্থার মস্তিষ্ক ও হৃদ্পিণ্ডে আঘাত।
কাতারের রাস লাফান এলএনজি স্থাপনায় হামলায় গ্যাসকে তরলে রূপান্তর করার দুটি ‘কোল্ড বক্স’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাতার এনার্জির প্রধান সাদ আল-কাবি মার্চে জানিয়েছিলেন, এসব যন্ত্রপাতি পুরোপুরি মেরামত করতে তিন থেকে পাঁচ বছর লাগতে পারে, যা বিশ্বের এলএনজি সরবরাহের ২০ শতাংশের জন্য বড় ঝুঁকি। একইভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের হাবশান গ্যাস কমপ্লেক্স, কাতারের পার্ল গ্যাস-টু-লিকুইডস শোধনাগার এবং আবুধাবির আল তাওয়েলাহ অ্যালুমিনিয়াম কারখানার স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনতেও দীর্ঘ সময় লাগবে। আল তাওয়েলাহ কারখানার ১ হাজার ২৬২টি স্মেল্টিং সেলের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং আগস্টের শেষ নাগাদ মাত্র এক-চতুর্থাংশ চালু করা সম্ভব হয়েছে; উৎপাদন পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে ২০২৭ সাল পর্যন্ত লাগতে পারে।
ইরানের এই অর্থনৈতিক যুদ্ধের প্রভাব কেবল জ্বালানি খাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। কুয়েতের পানি শোধনাগার ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে ২ মার্চ থেকে ২০ জুলাইয়ের মধ্যে অন্তত চারবার হামলা হয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব ইউটার মধ্যপ্রাচ্য কেন্দ্রের পরিচালক মাইকেল ক্রিস্টোফার লো সতর্ক করেছেন, পর্যাপ্ত সংখ্যক পানি শোধনাগার অচল করে দেওয়া গেলে কুয়েতের মতো দেশে কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পানির সংকট ভয়াবহ আকার নিতে পারে। এছাড়া বিমান চলাচল অবকাঠামো এবং অ্যামাজনের ডেটা সেন্টারের মতো ডিজিটাল সেবার স্থাপনাও হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সৌদি আরবের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে; যুদ্ধের প্রথম ছয় মাসে দৈনিক তেল উৎপাদন ১ কোটি ব্যারেল থেকে কমে ৭০ লাখের নিচে নেমে আসে। জাজান শোধনাগারে ২৫ জুলাই থেকে ৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে অন্তত চারবার হামলা হয়েছে। সেপ্টেম্বরের ১০ তারিখে সৌদি মরুভূমিতে তিনটি পাম্পিং স্টেশনে হামলার পর পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনে তেলের প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। যুদ্ধের পর থেকে সৌদি আরবের নয়টি বৃহত্তম শোধনাগারের পাঁচটি এবং তিনটি বড় তেল প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষক রায়ান স্টিভেনস ইরানের লক্ষ্য নির্বাচনের নির্ভুলতা ও ধৈর্যের প্রশংসা করেছেন। যদিও অনেক দেশ হামলার ক্ষয়ক্ষতি গোপন রাখার চেষ্টা করছে, কিন্তু শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার যন্ত্রপাতির ক্ষয়ক্ষতি কেবল ধ্বংসাবশেষের আঘাতে হওয়া অসম্ভব। আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর শক্তি যে কেবল সামরিক বাহিনীর ওপর নয়, বরং বিদ্যুৎ, পানি ও ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপরও নির্ভরশীল, তা ইরানের এই কৌশল আবারও প্রমাণ করেছে।