ইসরায়েলের রাজনীতিতে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘ শাসনের পতন ঘটাতে একবার মূল ভূমিকা রেখেছিলেন আরব রাজনীতিবিদ মনসুর আব্বাস। আসন্ন ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আবারও তিনি দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় কট্টর ইহুদি ভোটারদের সতর্ক করে বলছেন, তিনি ক্ষমতাচ্যুত হলে পরবর্তী সরকারের আসল ক্ষমতার চাবিকাঠি থাকবে মনসুর আব্বাসের হাতে, যা ইসরায়েলের জন্য অভ্যন্তরীণ এক বড় ঝুঁকি। তবে ডানপন্থী নেতাদের এই ভয় ও আক্রমণের তোয়াক্কা না করে এবারও নতুন এক ইহুদি রাজনীতিক ও সাবেক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে হাত মিলিয়ে মাঠে নেমেছেন ৫২ বছর বয়সী এই নেতা।
মনসুর আব্বাসের রাজনৈতিক দল ‘ইউনাইটেড আরব লিস্ট’ বা ‘রাম’ মূলত ১৯৯৬ সালে ইসরায়েলের ইসলামিক মুভমেন্টের একটি শাখার হাত ধরে গঠিত হয়েছিল। এটি সামাজিকভাবে একটি রক্ষণশীল মুসলিম দল। সাধারণত ডানপন্থী কট্টর ইহুদিদের সঙ্গে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন কিংবা অন্যান্য ইস্যুতে সংঘাত থাকলেও, আব্বাসের মূল মনোযোগ ইসরায়েলের ভূখণ্ডে বাস করা প্রায় ২০ শতাংশ আরব নাগরিকদের অধিকার রক্ষার ওপর। কট্টরপন্থী ইহুদিদের সহিংস অপরাধ ও বৈষম্যমূলক আবাসন নীতির শিকার এই আরব জনগোষ্ঠীকে ক্ষমতায়িত করাই তাঁর প্রধান লক্ষ্য। তাঁর মতে, ক্ষমতার প্রধান টেবিলে আর অবহেলিত হয়ে না থেকে মূলধারার রাজনীতিতে নিজেদের প্রভাব নিশ্চিত করাই সফলতার একমাত্র পথ।
পেশায় দন্ত চিকিৎসক মনসুর আব্বাসের রাজনীতিতে আসার পটভূমি ছিল বেশ আলাদা। গ্যালিলির মাঘার শহরে এক মুদিদোকানির ঘরে তাঁর জন্ম। ওই শহরে দ্রুজ, খ্রিষ্টান ও মুসলিমরা পাশাপাশি বাস করতেন। তরুণ বয়সে ও দন্ত চিকিৎসার দিনগুলোতে তিনি নিজের এলাকা ও স্কুলে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যকার বিরোধ নিষ্পত্তিতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আস্থা অর্জন করেন। নিজ শহরে সংঘাতের সময় মানুষের ঘরবাড়িতে আগুন ও প্রাণহানির ঘটনা দেখে তিনি চিকিৎসা পেশা সাময়িকভাবে স্থগিত রেখে ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণে নামেন। পরে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে মানুষের সেবা করার উদ্দেশ্যে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন তিন সন্তানের জনক এই আব্বাস। ২০১৯ সালে তিনি প্রথমবার ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে নির্বাচিত হন।
রাজনীতিতে আসার পর ২০২১ সালে মনসুর আব্বাস এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন। প্রথমে সরকার গঠনের জন্য নেতানিয়াহুর সঙ্গে আলোচনা চালালেও পরে নেতানিয়াহুকে উৎখাত করতে বিরোধী নেতা নাফতালী বেনেটের নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেন তিনি। এর মাধ্যমে টানা ১২ বছর ক্ষমতায় থাকা নেতানিয়াহু সরকারের পতন ঘটে। একই সঙ্গে এটিই ছিল ইসরায়েলের ইতিহাসে মূলধারার জায়নবাদী ও ইসলামপন্থী আরব দলের প্রথম জোটবদ্ধ সরকার। সেই সময় লোড শহরে কট্টরপন্থী ইহুদি মেয়রের পাশে দাঁড়িয়ে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত সিনাগগ পরিদর্শনে যান আব্বাস এবং সেটি পুনর্নির্মাণে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেন। এ ঘটনার পর নিজ সম্প্রদায়ের ভেতরে ও ইসলামিক মুভমেন্টে প্রচণ্ড সমালোচনার মুখে পড়লেও নিজের কৌশলী অবস্থান দিয়ে সবাইকে শান্ত করতে সক্ষম হন তিনি।
তবে ২০২২ সালের নির্বাচনে জিতে আবারও কট্টর ইহুদিবাদী সরকার গঠন করে ক্ষমতায় ফেরেন নেতানিয়াহু। এরপর ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস ইসরায়েলে আক্রমণ চালিয়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ জনকে হত্যা ও প্রায় ২৫০ জনকে জিম্মি করার পর পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। হামাসের হামলার দিনই মনসুর আব্বাস তার তীব্র নিন্দা জানান এবং গাজা সীমান্ত থেকে পালিয়ে আসা ইহুদিদের বাসস্থানের ব্যবস্থা করেন। তিনি স্পষ্ট জানান, সহিংসতা কেবল ফিলিস্তিনিদেরই ক্ষতি করেছে। প্রকাশ্যে হামাসের বিরোধিতা করায় অন্যান্য ফিলিস্তিনি ও আরব রাজনৈতিক দলের কাছে তিনি আস্থার সংকটে পড়েন, অন্যদিকে ইসরায়েলি কট্টরপন্থীরা তাঁকে উল্টো ‘সন্ত্রাসীদের অনুরাগী’ হিসেবে চিত্রায়িত করার চেষ্টা অব্যাহত রাখে।
এমন পরিস্থিতিতেও মনসুর আব্বাস তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে অটল রয়েছেন। সম্প্রতি নাজারেথে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, তাঁর দল ‘রাম’-এর প্রার্থী তালিকার দুই নম্বর স্থানে রাখা হয়েছে মধ্য-বামপন্থী ইহুদি আইনপ্রণেতা ও সাবেক শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা ইয়াভ সেগালোভিচকে। সেগালোভিচ বেনেট সরকারে জাতীয় নিরাপত্তা উপমন্ত্রী থাকার সময় আরব অধ্যুষিত এলাকায় অপরাধ দমনে টাস্কফোর্স গঠন করে হত্যাকাণ্ডের হার ১৬ শতাংশ কমিয়েছিলেন। যদিও নেতানিয়াহুর আমলে অপরাধ আবার বেড়ে গত বছর রেকর্ড ২৫২ জন আরব নাগরিক নিহত হন। হিব্রু ভাষায় বক্তব্য দিতে গিয়ে আব্বাস বলেন, ‘পরিবর্তন আনতে হলে অন্য মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে হবে, শত্রু হিসেবে নয়।’ সেগালোভিচও আব্বাসের এই সাহসকে ইসরায়েলের ভবিষ্যতের আশা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
নির্বাচনের প্রচারে আব্বাস এখন উত্তর ইসরায়েলের সাখনিন ও তুবা-জাঙ্গারিয়ার মতো আরব ও বেদুইন শহরগুলোতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তুবা-জাঙ্গারিয়ায় এক জনসভায় তিনি বলেন, ‘ক্ষমতাবানদের টেবিলে আমরা আর অনাথ হয়ে থাকব না।’ অপরদিকে সাখনিন শহরে ৫৩ বছর বয়সী ভোটার ইহসান বশির আব্বাসকে অনুরোধ জানান, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বেই হোক বা যার নেতৃত্বেই হোক, সহিংসতা থেকে সাধারণ আরব পরিবারগুলোকে বাঁচাতে আব্বাস যেন পরবর্তী সরকারে যোগ দেন। নিজের অবস্থানের স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়ে আব্বাস আগেই বলেছেন, ‘আমরা এমন সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চাই, যেখানে আমাদের কথা বলার সুযোগ থাকবে এবং প্রভাব থাকবে।’