রাজধানীতে মাদকের বিস্তার বর্তমানে এক উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বস্তির অলিগলি থেকে শুরু করে অভিজাত এলাকার বিলাসবহুল ফ্ল্যাট—সবখানেই অবাধে চলছে মাদকের কেনাবেচা ও সেবন। ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন এবং আইসের মতো মরণনেশা এখন সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মাদকসংশ্লিষ্ট অপরাধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নামও বারবার উঠে আসছে। পুলিশের এক অতিরিক্ত ডিআইজির ভাড়া দেওয়া ফ্ল্যাটে মাদকের আসর বসার ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এর আগে পুলিশের মাঠপর্যায়ের সদস্যদের ইয়াবাসহ গ্রেফতারের ঘটনাও ঘটেছে। যাদের ওপর মাদক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব, তাদের কেউ কেউ যদি অপরাধে জড়িয়ে পড়েন, তবে এই ভয়াবহ পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কতটা সম্ভব, তা নিয়ে জনমনে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সম্প্রতি রাজধানীর একটি অভিজাত এলাকায় পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আব্দুল্লাহ আল জহিরের একটি বিলাসবহুল থ্রিপ্লেক্স বাড়িতে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) অভিযান চালায়। সোমবার রাতের ওই অভিযানে বিদেশি মদ, গাঁজা, ইয়াবা ও মাদক সেবনের সরঞ্জামসহ ৮৪ জনকে আটক করা হয়, যার মধ্যে ৫৮ জন পুরুষ ও ২৬ জন নারী ছিলেন। ডিবি সূত্রে জানা গেছে, এয়ারবিএনবির মাধ্যমে বাড়িটি ভাড়া দেওয়া হলেও সেখানে নিয়মিত মাদকের আসর ও অবৈধ ডিজে পার্টির আয়োজন করা হতো। এর আগে ২৩ আগস্ট পল্লবী থানার এএসআই শফিকুল ইসলাম ৫ হাজার ৩১০ পিস ইয়াবাসহ এবং ২৭ সেপ্টেম্বর পুলিশ কনস্টেবল রেজাউল করিম ১ হাজার ৭৯০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার হন।
রাজধানীর কাওরান বাজার রেললাইন বস্তি, মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প, মহাখালী বাস টার্মিনাল, গাবতলী ও যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় মাদক কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে। সাভারের বিভিন্ন স্থানেও মাদক ব্যবসা চলছে। জেনেভা ক্যাম্পে মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রায়ই গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে গেন্ডারিয়া এলাকায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক পরিদর্শক গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এরপর ডিএনসি ও স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের যৌথ অভিযানে অনেক মাদক কারবারিকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং অবৈধ আস্তানাগুলো বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। গেন্ডারিয়ায় শনিবার বিকালে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের নেতৃত্বে অস্ত্র উঁচিয়ে চালানো মাদকবিরোধী অভিযানের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনার মুখে সোমবার তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন।
অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, বিচ্ছিন্নভাবে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়, কারণ এর পেছনে শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করছে। রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও কিছু অসাধু কর্মকর্তার সহযোগিতায় এই অবৈধ ব্যবসা টিকে আছে। খুচরা বিক্রেতাদের গ্রেফতার করা হলেও মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। কোনো পুলিশ সদস্য অপরাধে জড়ালে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং পুলিশের মূল লক্ষ্য মাদকের গডফাদার ও নেপথ্যের কুশীলবদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা।