ওয়েবসাইট তৈরি ও পরিচালনায় ব্যবহৃত বিশ্বখ্যাত প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ পিএইচপিতে দুটি গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি ধরা পড়েছে। এসব দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সাইবার হামলাকারীরা কোনো পাসওয়ার্ড ছাড়াই সরাসরি সার্ভারে প্রবেশ করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এমন পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য সাইবার হামলার ঝুঁকি এড়াতে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান তাদের ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নিরাপত্তা ত্রুটির মাধ্যমে হ্যাকাররা যেকোনো সার্ভারের ফাইল ও ডেটাবেজে সরাসরি প্রবেশাধিকার পেয়ে যেতে পারে এবং পুরো সিস্টেমের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা (এনএসএ) এক্সে (সাবেক টুইটার) প্রকাশিত এক বার্তায় সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে কালবিলম্ব না করে দ্রুত নিরাপত্তা আপডেট ইনস্টল করার আহ্বান জানিয়েছে। অবিলম্বে আপডেট দেওয়া সম্ভব না হলে ঝুঁকিপূর্ণ সিস্টেমগুলোর ইন্টারনেট সংযোগ অবিলম্বে বিচ্ছিন্ন রাখার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
সাইবার নিরাপত্তা গবেষক প্রতিষ্ঠান উইজের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে মোট ওয়েবসাইটের প্রায় ৭০ শতাংশই পিএইচপি দিয়ে পরিচালিত হয়। ফলে এই নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে অনলাইন মার্কেটপ্লেস, সংবাদমাধ্যম ও সরকারি সেবাসহ অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ওয়েব প্ল্যাটফর্ম ঝুঁকিতে পড়েছে। উইজ জানিয়েছে, সফটওয়্যারের ইতিহাস তথা পিএইচপিতে এখন পর্যন্ত ধরা পড়া সবচেয়ে গুরুতর দুর্বলতাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। অন্যদিকে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পিএইচপি ফাউন্ডেশনের নিরাপত্তা প্রকৌশলী ভলকার ডুশ মন্তব্য করেন, গত এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে পিএইচপি এত বড় সংকটে পড়েনি। তিনি এই ঘটনাকে ২০১৪ সালের আলোচিত ‘হার্টব্লিড’ ত্রুটির সঙ্গে তুলনা করেন, যার জেরে তৎকালীন সময়েও বিশ্বজুড়ে সফটওয়্যার আপডেটের হিড়িক পড়েছিল।
এই অভূতপূর্ব সিকিউরিটি বাগ বা ত্রুটি খুঁজে বের করার পেছনে ভূমিকা রেখেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। গত আগস্ট মাসে ওপেনএআইয়ের অর্থায়নে পিএইচপির কোড পর্যালোচনার সময় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা ‘ক্যালিফ’ প্রথম এআই মডেল ‘জিপিটি-৫.৬ সল’ ব্যবহার করে এই দুর্বলতা শনাক্ত করে। এর কয়েক সপ্তাহ পর গুগলের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘উইজ’ গুগলের ‘জেমিনি ৪ আর্গন’ ও ‘জিপিটি-৫.৬ সল’ ব্যবহার করে স্বাধীনভাবে বিষয়টি নিশ্চিত করে। এ প্রসঙ্গে ওপেনএআই এক্সে জানায়, পুরো ইন্টারনেটে প্রভাব ফেলতে পারে এমন বড় ত্রুটি এখন এআই নিজেই খুঁজে বের করতে পারছে, যা প্রযুক্তি জগতে এক নতুন যুগের সূচনা করল।
পরিস্থিতি সামাল দিতে গত বুধবার পিএইচপি প্রকল্পের ডেভেলপাররা নিরাপত্তা আপডেট প্রকাশ করেছেন। পিএইচপি ডেভেলপারদের অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান পিএইচপি ফাউন্ডেশন তাদের ব্লগ পোস্টে দ্রুততম সময়ে এই আপডেট গ্রহণের তাগিদ দিয়েছে। এর প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দেশের সরকার তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিয়েছে। ফ্রান্সে জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থার নির্দেশে প্যারিস পুলিশের ওয়েবসাইটসহ স্থানীয় প্রশাসনের সাইটগুলো বুধবার বিকেল থেকে বন্ধ রাখা হয়েছে। নেদারল্যান্ডসের জাতীয় সম্প্রচারমাধ্যম এনওএস জানায়, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ডিজিটাল পরিচয় যাচাই সেবা ‘ডিজিডি’, প্রতিনিধি পরিষদ এবং জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কেন্দ্রের ওয়েবসাইট অফলাইনে নেওয়া হয়েছে। বেলজিয়ামের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এক্সে বার্তা দিয়ে তাদের সাইট বন্ধের কথা জানায়, যদিও তাদের দেশে তখন পর্যন্ত হামলার কোনো খবর মেলেনি। এছাড়া অস্ট্রেলিয়ার সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা অস্ট্রেলিয়ান সিগন্যালস ডিরেক্টরেটের নিজস্ব ওয়েবসাইট ‘সাইবার ডট গভ ডট এইউ’ আক্রান্ত সাইটগুলোর তালিকায় রয়েছে বলে দেশটির সম্প্রচারমাধ্যম এবিসি নিশ্চিত করেছে।