ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে শিক্ষা খাতে অর্থায়ন বাড়ানো এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার মানুষ বিক্ষোভ করেছেন। শনিবারের এই বড় আকারের বিক্ষোভ প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সরকারের জন্য নতুন করে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে। বিক্ষোভের একপর্যায়ে প্যারিসসহ বেশ কিছু শহরে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালায়।
প্যারিসের কেন্দ্রীয় এলাকা এড়িয়ে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে নির্ধারিত পথে এই মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। তবে সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও চলাচলের বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও বিপুলসংখ্যক মানুষ এতে অংশ নেন। শুক্রবার প্যারিসে পুলিশ বিক্ষোভ মিছিলের নির্ধারিত পথ পরিবর্তন করে দেয়। মিছিলের শুরুর স্থান বাস্তিল চত্বরে মাইক ব্যবহার করে লোকজনকে সরে যেতে বলা হয় এবং অন্যথায় ১৩৫ ইউরো জরিমানার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। ৫৮ বছর বয়সী নার্স সৌমায়া আবেদ জানান, তিনি ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন, কিন্তু পোর্ত দ্য ইতালি থেকে মিছিল শুরু হতে দেখেননি। তিনি মনে করেন, গত সপ্তাহের ঘটনা ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের থামানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, কিন্তু এতে আন্দোলন থামবে না।
লিওঁ, ক্লেরমঁ-ফেরাঁ ও স্ত্রাসবুর্গ শহরে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে এবং নিস ও নঁতে শহরে জলকামান ব্যবহার করা হয়। মার্সেই শহরে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলে সেখানেও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করা হয়। মার্সেই শহরে পুলিশ ১৭ হাজার বিক্ষোভকারীর কথা বললেও শ্রমিক সংগঠন সিজিটি দাবি করেছে সেখানে এক লাখ মানুষ অংশ নিয়েছেন। এছাড়া তুলুজ শহরে কর্তৃপক্ষের হিসাবে ২৬ হাজার ৫০০ জন অংশ নেন। লিওঁ, নিস ও মন্টপেলিয়েসহ কয়েকটি শহরে সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, যা সংবিধানস্বীকৃত মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থী বলে শ্রমিক সংগঠনগুলো সমালোচনা করেছে।
প্যারিসের সরকারি কৌঁসুলির দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শনিবারের ঘটনায় মোট ৬৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যার মধ্যে ৪০ জনকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে ছয়জন অপ্রাপ্তবয়স্ক। মূলত সহিংসতা, সম্পদের ক্ষতিসাধন এবং অস্ত্রসংক্রান্ত অপরাধের প্রস্তুতির অভিযোগে তাদের আটক করা হয়। বিক্ষোভ মোকাবিলায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ সারা দেশে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করেছিলেন, যাদের সহায়তায় হেলিকপ্টার, সাঁজোয়া যান ও জলকামান প্রস্তুত রাখা হয়। গত সপ্তাহের বিক্ষোভে কয়েকটি শহরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি বলে সোমবার স্বীকার করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ। তিনি পদত্যাগের প্রস্তাব দিলেও প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ তা গ্রহণ করেননি।
গত মাসে প্যারিসের একটি উচ্চবিদ্যালয়ে কর্মীসংকটের প্রতিবাদে শুরু হওয়া এই আন্দোলন বর্তমানে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীরা উন্নত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দাবিতে এবং কর্মীরা মজুরি বৃদ্ধি ও পেনশনের দাবিতে আন্দোলনে শামিল হয়েছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, শিক্ষক সংকটের কারণে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে প্রায় ১ কোটি ৫৪ লাখ ঘণ্টার পাঠদান ব্যাহত হয়েছে। শিক্ষার্থীরা জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে মাসিক ভাতা ২০০ ইউরো বাড়ানো এবং সরকারি ছাত্রাবাসের ভাড়া স্থগিত রাখার দাবি জানিয়েছেন। লুই লেদু-জাতার নামের এক বিক্ষোভকারী বলেন, তারা যুক্তরাষ্ট্রের মতো বৈষম্যপূর্ণ সমাজে পরিণত হতে চান না। শুক্রবার শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যবস্থা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তবুও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ না আসা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তারা।
২০১৭ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে এ পর্যন্ত সবচেয়ে কম জনপ্রিয়তার মুখে পড়েছেন মধ্যপন্থী প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ। আগামী মে মাসে ভোটাররা তার উত্তরসূরি নির্বাচন করবেন। এমন পরিস্থিতিতে কট্টর ডানপন্থী ন্যাশনাল র্যালি দল জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের ব্যর্থতার অভিযোগ তুলেছে। ওর্লেয়াঁ শহরে মেরিন লো পেনের ন্যাশনাল র্যালির সম্মেলনের সময়ও হাজারো মানুষ শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করেছেন। নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে ল্যুভর, ওর্সে, পিকাসো জাদুঘর ও গ্রঁ পালে বন্ধ রাখা হয়েছিল এবং আর্ট বাসেল প্রদর্শনীর সপ্তাহান্তের কর্মসূচি বাতিল করা হয়েছে। আগামী ৩১ অক্টোবর ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের সংগঠকরা আবারও বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন।