একসময় শিকাগোর সিয়ার্স টাওয়ারের স্থপতি এফআর খানের মতো বাংলাদেশিদের সাফল্যে দেশবাসী গর্ববোধ করত। কিন্তু বর্তমান সময়ে কিছু মানুষের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশিদের গ্রহণযোগ্যতা ও ভাবমূর্তি বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে। যদিও বিশ্বের অনেক প্রান্তে বাংলাদেশিরা নিজেদের অবস্থান গড়ে তুলেছেন, তবুও গত কয়েক বছরে বিভিন্ন দেশে ভিসা আবেদনে জালিয়াতি, ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট, মিথ্যা তথ্য প্রদান এবং জাল সার্টিফিকেট ব্যবহারের প্রবণতা এই নেতিবাচক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।
এর ফলে শক্তিশালী পাসপোর্টের তালিকায় বাংলাদেশ ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছে। হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী, বছরের শুরুর দিকে ৯৫তম অবস্থানে থাকলেও জুলাই মাসে বাংলাদেশ ৯৭তম স্থানে নেমে এসেছে। বর্তমানে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীরা বিশ্বের ৩৫টি দেশে ভিসামুক্ত সুবিধা পাচ্ছেন, যা ২০২৫ ও জানুয়ারি ২০২৬ সালে ছিল ৩৭টি দেশ। এছাড়া ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশিরা শীর্ষে রয়েছেন। ফ্রন্টেক্সের তথ্যমতে, ২০০৯ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশি এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। শুধুমাত্র ২০২৫ সালেই ২০ হাজার ২৫৯ জন এবং ২০২৬ সালের প্রথম ৬ মাসে ৪ হাজার ২৪৯ জন বাংলাদেশি ইতালিতে প্রবেশ করেছেন।
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবিরের মতে, এই ভাবমূর্তি সংকটের পেছনে আমাদের অভ্যন্তরীণ সুশাসনের ঘাটতি এবং সক্ষমতার অভাব দায়ী। তিনি বলেন, দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও রেগুলেটরি মেকানিজমের দুর্বলতার কারণে বাইরের বিশ্বে বাংলাদেশিদের নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এছাড়া দেশের ভেতরের রাজনৈতিক বিভাজন বিদেশেও সংক্রমিত হওয়ায় প্রবাসীদের মধ্যে দলাদলি ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে, যা স্থানীয়দের কাছে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে।
ভিসা আবেদনে জালিয়াতির বিষয়ে চলতি বছরের এপ্রিলে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা ১৩টি দেশ যৌথভাবে সতর্কবার্তা দিয়েছে। এরপরেও ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও সলভেন্সি সার্টিফিকেট জমা দেওয়ার অভিযোগ থামেনি। ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুকও চলতি বছরের মে মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের কাছে এই উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান জানান, নথিপত্রে নাম-বয়সের অমিল এবং জালিয়াতির কারণে প্রকৃত শিক্ষার্থী ও বৈধ যাত্রীরাও বিমানবন্দরে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
শ্রমবাজারের ক্ষেত্রেও একই নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কর্মী নিয়োগ কমেছে এবং লাওসের মতো দেশ বাংলাদেশিদের জন্য শ্রমিক নিয়োগ ও ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। ব্র্যাকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিদেশ থেকে ডিপোর্ট বা ফেরত পাঠানো বাংলাদেশির সংখ্যা ২০১৩-১৪ সালের ৩৭-৪০ হাজার থেকে বেড়ে ২০২২-২০২৫ সালে ৭৫ হাজার ছাড়িয়েছে। এই পরিস্থিতি উত্তরণে সরকার ও জনগণের মধ্যে বিশ্বাসের জায়গা শক্তিশালী করা এবং সামাজিক শৃঙ্খলা ও সুশাসন নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।