আল্লাহ-তাআলা মানুষের স্রষ্টা। তিনি জানেন, মানুষের জন্য কোন বিধান কখন কল্যাণকর ও কোন পরিস্থিতিতে কেমন দিকনির্দেশনা উপযোগী। একসময় কার্যকর কোনো বিধানের স্থলে পরবর্তী ওহির মাধ্যমে অন্য বিধান আসার মধ্যে গভীর প্রজ্ঞা নিহিত রয়েছে। এই বিধান পরিবর্তনকে বলে ‘নাসখ’। নাসখ হলো পূর্ববর্তী কোনো বিধানের কার্যকারিতা পরবর্তী দলিলের মাধ্যমে সমাপ্ত হওয়া। কোরআনের সুরা বাকারার ১০৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘আমি কোনো আয়াত রহিত করলে কিংবা ভুলিয়ে দিলে তার চেয়ে উত্তম অথবা তার অনুরূপ কিছু নিয়ে আসি।’ এটি প্রমাণ করে, বিধান রহিত করা আল্লাহর ক্ষমতা ও ইচ্ছার অধীন। তাঁর কোনো সিদ্ধান্তই অজ্ঞতা, ভুল, অপারগতা কিংবা অসহায়ত্বের ফল নয়। রহিত বিধানের পরিবর্তে আগত বিধান মানুষের জন্য অধিক উপকারী বা সহজতর হয়। আবার কখনো তা আগেরটির অনুরূপও হতে পারে (ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ১/২৯৫, দারুল কিতাব আল-আরবি, বৈরুত, ২০১১)।
আলেমরা এই নাসখ বা রহিতকরণ পদ্ধতিকে মোটামুটি তিন ভাগে ভাগ করেছেন। প্রথমত, তেলাওয়াত বা পাঠ্যরূপ বহাল থাকে কিন্তু বিধান রহিত হয়। কোরআনে এ ধরনের উদাহরণই বেশি আলোচিত। দ্বিতীয়ত, পাঠ্যরূপ রহিত হয় কিন্তু বিধান বহাল থাকে। তৃতীয়ত, পাঠ্যরূপ ও বিধান উভয়ই রহিত হয় (মুহাম্মদ আবদুল আজিম জুরকানি, মানাহিলুল ইরফান ফি উলুমিল কুরআন, ২/১৬৭, দারুল কিতাব আল-আরবি, বৈরুত, ১৯৯৫)। এ কারণে কোনো আয়াতের পাঠ্যরূপ থাকা মানেই তার বিধান কার্যকর, এমন ধারণা সঠিক নয়। আবার বিধান রহিত হলে আয়াতের মর্যাদা কমে যায়, এ ধারণাও ভুল। বিধানের কার্যকারিতা ও আল্লাহর বাণী হিসেবে আয়াতের মর্যাদা দুটি আলাদা বিষয়। বিধান রহিত হলেও যে আয়াত কোরআনের অংশ হিসেবে বহাল থাকে, তার পাঠ্যরূপ ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে।
মানুষের সামর্থ্য ও সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় শরিয়তের কোনো বিধান এক সময়ে এক রকম এবং অন্য সময়ে ভিন্ন হতে পারে। এর একটি সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত যুদ্ধক্ষেত্রে মুমিনদের দৃঢ়তাসংক্রান্ত বিধান। প্রথমে আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে বিশজন ধৈর্যশীল থাকলে তারা দুই শজনের ওপর বিজয়ী হবে’ (সুরা আনফাল, আয়াত: ৬৫)। পরের আয়াতে বলেন, ‘এখন আল্লাহ তোমাদের ভার লাঘব করে দিলেন এবং তিনি জানেন যে তোমাদের মধ্যে দুর্বলতা রয়েছে’ (সুরা আনফাল, আয়াত: ৬৬)। অধিকাংশ মুফাসসির এ ঘটনাকে নাসখের আলোচনায় উল্লেখ করেছেন (ইমাম কুরতুবি, আল-জামি লিআহকামিল কুরআন, ১০/৭০-৭১, মুআসসাহ আর-রিসালাহ, বৈরুত, ২০০৬)। এখানে লক্ষণীয়, আল্লাহ শুরু থেকেই মুমিনদের শক্তি ও দুর্বলতা জানতেন। সময়ের বাস্তবতা অনুযায়ী বিধানের ভার লাঘব করা হয়েছে মাত্র। রমজানের রোজা প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান, কঠিন করতে চান না’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৫)। এটি শরিয়তের সহজতার মৌলিক নীতি তুলে ধরে।
আয়াত রহিত করার আরেকটি তাৎপর্য হলো ক্রমান্বয়ে মানুষকে বড় পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত করা। মদ হারাম হওয়ার ধাপগুলো এর স্পষ্ট উদাহরণ। প্রথমে মদ ও জুয়া সম্পর্কে বলা হয়েছে, এ দুটিতে বড় পাপ ও মানুষের জন্য কিছু উপকারও আছে, তবে পাপ উপকারের চেয়ে বড় (সুরা বাকারা, আয়াত: ২১৯)। পরে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাজের কাছে যেতে নিষেধ করা হয় (সুরা নিসা, আয়াত: ৪৩)। সবশেষে সুরা মায়িদায় মদকে শয়তানের কাজ আখ্যা দিয়ে তা বর্জনের চূড়ান্ত নির্দেশ আসে (সুরা মায়িদা, আয়াত: ৯০)। কিবলা পরিবর্তন আয়াত রহিত করার অন্যতম সুস্পষ্ট ও শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত। রাসুল (সা.) ও সাহাবিরা প্রথমে বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করতেন। পরে আল্লাহর নির্দেশে কাবা শরিফ মুসলমানদের কিবলা নির্ধারিত হয়। আল্লাহ বলেন, ‘আপনি আগে যে কিবলার ওপর ছিলেন, তা এ উদ্দেশ্যেই নির্ধারণ করেছিলাম, যাতে প্রকাশ পায় কে রাসুলের অনুসরণ করে আর কে পেছনে ফিরে যায়’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৪৩)।
নাসখ নিয়ে ভুল ধারণার একটি বড় কারণ হলো একে মানুষের আইন পরিবর্তনের সঙ্গে তুলনা করা। মানুষ সাধারণত নতুন পরিস্থিতি বুঝে, আগের সিদ্ধান্তে ভুল ধরা পড়লে কিংবা পুরোনো আইন অকার্যকর হলে আইন বদলায়। আল্লাহর বিধানে এমন ধারণা প্রযোজ্য নয়। আল্লাহর জ্ঞান অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে পরিব্যপ্ত করে। কোন বিধান কখন কার্যকর হবে, কত দিন থাকবে, কখন তার স্থলে অন্য বিধান আসবে, সবই তাঁর অনাদি জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। সুরা বাকারার ১০৬ নম্বর আয়াতের পর আল্লাহ বলেন, ‘তুমি কি জানো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান?’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১০৭)। রহিত হওয়ার দাবিতে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। কেউ নিজের যুক্তি, পছন্দ বা সমসাময়িক পরিস্থিতির অজুহাতে কোরআনের কোনো বিধানকে রহিত ঘোষণা করতে পারেন না। কোনো আয়াতের বিধান রহিত দাবি করার আগে সংশ্লিষ্ট আয়াত ও হাদিসের দলিল, দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য বর্ণনা এবং দুই আয়াতের মধ্যে সমন্বয়ের কোনো গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি আছে কি না তা যাচাই করা জরুরি। মুমিনের দায়িত্ব হলো কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশ যথাযথভাবে বোঝা এবং আল্লাহর নির্দেশের সামনে নিজের ইচ্ছাকে প্রাধান্য না দেওয়া। বিধানের সব হেকমত বুঝতে না পারলেও মুমিন বিশ্বাস করেন, আল্লাহর প্রতিটি নির্দেশ তাঁর পরিপূর্ণ জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ভিত্তিতেই নির্ধারিত।
উভয় ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশের কর্তৃত্ব প্রকাশ পেলেও আলোচনার ক্ষেত্র ও দলিল আলাদা।আল্লাহ বলেন, ‘আর যখন আমি এক আয়াতের স্থলে অন্য আয়াত পরিবর্তন করে দিই, তখন আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেন, সে সম্পর্কে তিনিই সর্বাধিক জ্ঞাত।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ১০১)অর্থাৎ কেন একটি বিধানের স্থলে অন্য বিধান আসে, তার পূর্ণ জ্ঞান তাঁরই।
(ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ১/২৯৪, দারুল কিতাব আল-আরবি, বৈরুত, ২০১১)অতএব দুটি আয়াতের মধ্যে আপাত অর্থগত পার্থক্য দেখলেই একটিকে অন্যটির দ্বারা রহিত ঘোষণা করা সঠিক পদ্ধতি নয়।