পৃথিবীতে মানবজাতি সৃষ্টির ঘোষণা দিয়ে আল্লাহতায়ালা যখন ফেরেশতাদের তাঁর ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেছিলেন, তখন তারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কার কথা জানিয়েছিল। কারণ, মানব সৃষ্টির প্রায় দুই হাজার বছর আগে পৃথিবীতে জিন জাতির বসবাস ছিল। জিনেরা সর্বত্র ফিতনা ও অশান্তি ছড়াতে থাকায় আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতারা তাদের সমতল ভূমি থেকে তাড়িয়ে সমুদ্রের বিভিন্ন দ্বীপে পাঠিয়ে দেয় (মুসতাদরাকুল হাকিম: ৩০৩৫)। এরপর মহান আল্লাহ প্রথম মানব হিসেবে হযরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করেন এবং ফেরেশতারা তাঁকে সিজদা করেন।
জান্নাতে একা বসবাস করার সময় আদম (আ.) একাকী বোধ করতেন। কথা বলা, প্রশান্তি লাভ করা ও ভালোবাসা বিনিময় করার জন্য কোনো সঙ্গিনী তাঁর ছিল না। একদিন ঘুম থেকে জেগে উঠে আদম (আ.) দেখতে পান, তাঁর মাথার কাছে এক অচেনা নারী বসে আছেন। পরিচয় জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানান, 'আমি নারী।' পরে সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'আপনার প্রশান্তির জন্য।' এভাবে জান্নাতে হযরত হাওয়া (আ.)-এর আগমন ঘটে।
পবিত্র কোরআনের সুরা নিসার ১ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, 'হে মানুষ, তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তা থেকে তাঁর স্ত্রী সৃষ্টি করেন, যিনি তাঁদের দুজন থেকে বহু নারী-পুরুষ ছড়িয়ে দেন।' এই আয়াতের তাফসির প্রসঙ্গে 'কাসাসুল কোরআন' (প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৪০)-এ উল্লেখ করা হয়েছে, হাওয়া (আ.)-কে আদম (আ.) থেকে সৃষ্টির ক্ষেত্রে দুটি সম্ভাবনার কথা বলা হয়। প্রথমত, পুরুষের স্বজাতীয় হিসেবেই নারীকে সৃষ্টি করা হয়েছে, যেন তিনি জীবনসঙ্গিনী হতে পারেন। দ্বিতীয়ত, আদম (আ.)-এর পাঁজরের হাড় থেকে তাঁকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তাফসিরবিদদের মতে, প্রথম ব্যাখ্যাটিই অধিক গ্রহণযোগ্য, যার সারমর্ম হলো নারী জাতি পুরুষের সমজাতীয় হিসেবেই সৃষ্ট।
অন্যদিকে হাদিস শরিফে নারীকে পাঁজরের হাড় থেকে সৃষ্টির উপমা দিয়ে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'তোমরা নারীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো। তাদের পাঁজরের হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং হাড়ের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বাঁকা হাড় হলো এটা (আর তা থেকেই নারীদের সৃষ্টি করা হয়েছে)। তুমি যদি তা সোজা করতে যাও, তাহলে তা ভেঙে যাবে আর যদি ছেড়ে দাও, তাহলে সব সময় তা বাঁকাই থাকবে। কাজেই নারীদের উত্তম উপদেশ দিতে থাকো' (বোখারি: ৫১৮৫)।
জান্নাতে আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.) একসঙ্গে বসবাস শুরু করেন। সেখানে তাঁদের জন্য অফুরন্ত নেয়ামতের সুব্যবস্থা ছিল এবং তাঁরা ইচ্ছামতো ঘোরাফেরা ও খাদ্য গ্রহণ করতেন। তবে আল্লাহতায়ালা একটি নির্দিষ্ট গাছ দেখিয়ে তাঁদের সতর্ক করে দেন। সুরা আরাফের ১৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, 'আর আমি বললাম, হে আদম, তুমি তোমার সঙ্গিনীকে নিয়ে জান্নাতে বাস করো এবং যেখানে ইচ্ছা যাও বা যা ইচ্ছা খাও, কিন্তু ওই গাছের কাছে যেয়ো না, গেলে তোমরা সীমালঙ্ঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।'
তবে প্রথম দিন থেকেই শয়তান বা ইবলিস আদম (আ.)-কে শত্রু মনে করে ধোঁকা দেওয়ার সুযোগ খুঁজছিল। সরাসরি আদম (আ.)-কে প্ররোচিত করতে ব্যর্থ হয়ে ইবলিস হাওয়া (আ.)-কে লক্ষ্যবস্তু বানায় এবং নিষিদ্ধ গাছের কাছে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়। শয়তানের ফাঁদে পড়ে হাওয়া (আ.) আদম (আ.)-কে নিয়ে সেই নিষিদ্ধ গাছের ফল ভক্ষণ করেন। এই সীমালঙ্ঘনের শাস্তি হিসেবে মহান আল্লাহ তাঁদের জান্নাত থেকে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেন, যার মাধ্যমে ধরণীতে মানবজাতির বসবাসের সূচনা হয়।