সাতক্ষীরার সবচেয়ে ঝুঁকিভিত্তিক উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর অন্যতম আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়ন। জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র চাপে এখানকার ২৩টি গ্রাম ক্রমাগত জনশূন্য হয়ে পড়ছে। নদীভাঙন ও স্থানান্তরের কারণে একের পর এক এলাকা খালি হওয়ায় মানুষের অনিশ্চয়তা যেমন বাড়ছে, তেমনই বাড়ছে শিশুদের সুরক্ষা ও শিক্ষা জীবনের ঝুঁকি। হাওলাদার পাড়াসহ লাগোয়া হরিশখালী, কুড়িকাহুনিয়া, শ্রীপুর, বনতলা ও দিঘলারাইটের পুরুষেরা জীবনযাত্রার তাগিদে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল বা নারায়ণগঞ্জে চলে যাচ্ছেন। অন্যদিকে নারীরা কাজের খোঁজে যশোরে গেলেও ফিরে আসেন, কিন্তু পুরুষদের ফিরে আসার হার বেশ কম।
অভিভাবকদের এভাবে কাজের খোঁজে বাইরে চলে যাওয়ার কারণে সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত হয়ে পড়ছে এলাকাটির শিশু-কিশোরেরা। হাওলাদার পাড়ার ‘বাবুই পাখি’ কমিউনিটি শিশু দলের প্রধান ও স্থানীয় ইউনাইটেড একাডেমির শিক্ষার্থী তামান্না সুলতানা মনে করে, উপার্জনক্ষম মানুষের এলাকা ছেড়ে যাওয়াই মূল সমস্যা তৈরি করছে। বড়রা সঙ্গে না থাকলে শিশুদের ওপর পাচারের ঝুঁকি বাড়ে এবং অসৎ মানুষের হাত থেকে ছোটদের রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া নিরাপদ পানির তীব্র সংকট, দূরবর্তী স্কুলে যাতায়াতের দুর্ভোগ, চর্মরোগ, ডায়রিয়া ও বাল্যবিবাহ উপকূলের শিশুদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আসন্ন জলবায়ু সম্মেলনকে সামনে রেখে সম্প্রতি খুলনায় সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের শিশুদের এক সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও স্থানীয়ভাবে নেওয়া নানা উদ্যোগের হিসাব-নিকাশ তুলে ধরে প্রতিনিধিরা। আগামীতে তুরস্কের আনাতোলিয়ায় অনুষ্ঠেয় বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলনে খুলনার এই শিশু প্রতিনিধিদেরও অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। প্রতাপনগরের ইউনাইটেড একাডেমিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে কমছে। প্রতিষ্ঠানটিতে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় ৬২ জনের মধ্যে পাস করেছে মাত্র ২৬ জন। এর আগে ২০২৫ সালে ১৫ জন ফেল করলেও ২০২৩ সালে শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছিল। করোনা মহামারির পর ২০২১-২০২২ সালে প্রায় ১৪ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে।
বিশেষ করে কার্তিক মাসে ছেলেদের একটি বড় অংশ ইটভাটায় কাজ করতে চলে যাওয়ায় তারা বার্ষিক পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে না। বৈশাখে কাজ শেষ করে ফিরলে স্কুল আর তাদের ভর্তি নেয় না। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইটভাটায় কাজ শুরুর আগে শহরের প্রায় ৮০ শতাংশ এবং গ্রামের ৮৪ শতাংশ শিশু নিয়মিত স্কুলে যেত। উপকূল থেকে কত শিশু এভাবে ইটভাটায় যায় তার কোনো সরকারি তথ্য নেই, তবে প্রতি ইটভাটার মৌসুমে সাতক্ষীরা থেকে রিজার্ভ বাস দেশের অন্তত ১০টি জেলায় যায়। দালালরা পরিবারকে অগ্রিম ‘দাদন’ দিয়ে শিশুদের কাজে পাঠাতে বাধ্য করে। পূর্বে কুমিল্লার ইটভাটায় কাজ করা আব্বাস ও অন্য শিশু শ্রমিকদের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, বাবার অনুপস্থিতি বা পারিবারিক ঋণের দাদন শোধ করতেই ছোট বয়সেই শিশুরা চরম ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে জড়িয়ে পড়ছে। এমনকি ২০২০ সালের নভেম্বরে সাতক্ষীরার শিশু জাহিদুল ইটভাটায় কষ্টের কাজ ছেড়ে বাড়ি ফিরতে চাইলে মালিক পক্ষ তাকে ছাড়েনি, পরে সেখান থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।
মেয়েরা ইটভাটায় না গেলেও অভিভাবকরা কাজের খোঁজে বাইরে গেলে তাদের ওপর বাল্যবিবাহের চাপ আসে। বিয়ের পর মেয়েরা স্কুলে ফিরতে চাইলে সামাজিক অলিখিত নিয়মে স্কুলগুলো তাদের আর সুযোগ দেয় না, যদিও বিবাহিত ছেলেদের পড়াশোনায় বাধা দেওয়া হয় না। এই নানামুখী সংকট সত্ত্বেও স্থানীয় কিশোর-কিশোরীরা নিজেদের উদ্যোগে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে। প্রতাপনগরের এক ভাঙনকবলিত সড়কে খাল তৈরি হলে যাতায়াত বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে শিশুদের উদ্যোগে ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সহায়তায় একটি ভাসমান সেতু তৈরি করা হয়, যা বর্তমানে ১৪০ জন শিক্ষার্থীর নিরাপদে স্কুলে যাওয়ার পথ সুগম করেছে। প্রতাপনগরের কিশোরীদের উত্থাপিত প্রধান চাহিদার মধ্যে রয়েছে:
প্রতিটি পাড়ায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও লবণমুক্ত নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা। উঁচু ও জলাবদ্ধতাসহিষ্ণু স্কুল ভবন ও শৌচাগার নির্মাণ। শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য বিকাশ ও খেলাধুলার নিরাপদ পরিবেশ তৈরি। অপুষ্টি শনাক্তকরণ ও পুষ্টিসহায়তা প্রদান। টেকসই বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণ ও শিশুবান্ধব দুর্যোগ প্রস্তুতি গ্রহণ। নিজেদের উদ্ভাবনী শক্তির প্রমাণ দিয়ে হাওলাদার পাড়ার তামান্না সুলতানা আহ্বান জানিয়ে বলে, সেতু যেভাবে আমরা তৈরি করতে পেরেছি, বাকি কাজগুলোও আমরা পারব। কিশোরীদের ‘কিশোর গ্যাং’ হিসেবে না দেখে ‘কিশোর শক্তি’ হিসেবে বিবেচনা করে পাশে থাকার অনুরোধ জানায় তারা।
২০২১–২০২২ সালে প্রায় ১৪ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে যায়।