ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীতে নৌকার মাঝিদের কাছ থেকে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। ঘাট ইজারাদার সুমন ভূঁইয়া ও তার লোকজন এই চাঁদা আদায় করছেন বলে ভুক্তভোগী মাঝিরা জানিয়েছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিটি পারাপারের জন্য যাত্রীদের কাছ থেকে নেওয়া ৫০ টাকা ভাড়ার মধ্যে ২০ টাকা ইজারাদারকে দিতে বাধ্য করা হয়। এই অতিরিক্ত চাঁদা আদায়ের প্রতিবাদে গত রোববার একদল মাঝি বিআইডব্লিউটিএ অফিসে জড়ো হন।
বিআইডব্লিউটিএর পোর্ট অফিসার মোবারক হোসেন মজুমদার বিষয়টি সমাধানের লক্ষ্যে তাৎক্ষণিকভাবে সুমন ভূঁইয়ার প্রতিনিধি জাকির হোসেনকে তলব করলেও সমস্যার কোনো সুরাহা হয়নি। ভুক্তভোগী মাঝি আলম হোসেন ও সোহেল জানান, ওয়াইজঘাট তিন ফেরি থেকে কেরানীগঞ্জের ব্রিজঘাট পর্যন্ত নৌকা চালিয়ে তারা জীবিকা নির্বাহ করেন। বর্তমানে নৌকায় ইঞ্জিন লাগানোর পর যাত্রীপ্রতি ১০ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। পাঁচজন যাত্রী নিয়ে নৌকা ছাড়লে মোট ৫০ টাকা পাওয়া যায়, যার মধ্যে ২০ টাকা ইজারাদারকে দিতে হয়। প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ বার লোক পারাপার করতে গিয়ে একজন মাঝিকে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়।
মাঝিদের অভিযোগ, চাঁদা দেওয়ার পর জ্বালানি তেল ও অন্যান্য খরচ বাদে তাদের হাতে কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। ওয়াইজঘাট এলাকায় প্রায় দুই শতাধিক মাঝি নিয়মিত যাত্রী পারাপার করেন, যার ফলে প্রতিদিন লক্ষাধিক টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে সুমন ভূঁইয়া ও তার লোকজনের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, আওয়ামী শাসনামলে এই ঘাট নিয়ন্ত্রণ করতেন আলমগীর। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শ্রমিক দলের আহ্বায়ক সুমন ভূঁইয়া এলাকাটি দখলে নেন এবং ইজারা নিয়ে এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করছেন।
এ বিষয়ে সুমন ভূঁইয়া মাঝিদের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। তিনি জানান, তিনি বৈধভাবে ইজারা নিয়েছেন এবং বিআইডব্লিউটিএর নিয়ম অনুযায়ী যাত্রীপ্রতি দুই টাকা করে টোল আদায়ের কথা থাকলেও মাঝিরা নিজেরা নিয়ম পরিবর্তন করে অতিরিক্ত টাকা নিচ্ছে। অন্যদিকে, বিআইডব্লিউটিএর সদরঘাট পোর্ট অফিসার মোবারক হোসেন মজুমদার জানান, ইঞ্জিনচালিত ট্রলার বা ফাইবার বোটপ্রতি ১২ জন যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রে ৫০ থেকে ১০০ টাকা টোল আদায়ের শর্তে ঘাটটি ইজারা দেওয়া হয়েছে।
ওয়াইজঘাট তিন ফেরি থেকে কেরানীগঞ্জের ব্রিজঘাটে পারাপারের নৌকার মাঝি আলম হোসেন ও সোহেল আমার দেশকে জানান, তারা বুড়িগঙ্গার নৌকার মাঝি। নৌকায় ওয়াইজঘাট থেকে কেরানীগঞ্জের ব্রিজঘাট পর্যন্ত নদীপথে নৌকা পারাপারের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। আগে বৈঠা দিয়ে নৌকা চালাতেন। সম্প্রতি দ্রুত যাতায়াতের জন্য নৌকায় ইঞ্জিন লাগিয়েছেন। ওয়াইজঘাট তিন ফেরি থেকে কেরানীগঞ্জের ব্রিজঘাট পর্যন্ত নৌকায় মানুষ পারাপার করেন। এজন্য যাত্রীপ্রতি তাদের ১০ টাকা করে ভাড়া দিতে হয়। পাঁচজন যাত্রী হলেই নৌকা ছেড়ে দিতে হয়। পাঁচজনর কাছ থেকে তারা মোট পেয়ে থাকেন ৫০ টাকা। এ ৫০ টাকা থেকে ২০ টাকা চাঁদা দিতে হয় ঘাট ইজারাদার ও সদরঘাট শ্রমিক দলের সভাপতি সুমন ভূঁইয়া ও তার লোকজনকে। যতবার লোক নিয়ে ঘাটে আসবে মাঝিরা, ততবারই ২০ টাকা করে চাঁদা দিতে হবে। এরকম প্রতিদিন একজন মাঝিকে ২৫ থেকে ৩০ বার লোক বহনের জন্য সারাদিনে ৫০০-৬০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়।
স্থানীয়রা জানায়, ওয়াইজঘাট তিন ফেরি আওয়ামী শাসনামলে নিয়ন্ত্রণ করত সাবেক নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খানের দূরসম্পর্কের ভাগনে আলমগীর। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এলাকাটি দখলে নেয় ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শ্রমিক দলের আহ্বায়ক সুমন ভূঁইয়া। এরপর ২০২৫-২৬ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ইজারা নিয়ে ওয়াইজঘাট তিন ফেরিঘাট এবং সদরঘাট লেবার হ্যান্ডেলিং শুল্ক আদার কেন্দ্র এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন সুমন ভূঁইয়া।