ওমানের সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল সংক্রান্ত একটি খসড়া চুক্তি চূড়ান্ত করার পর্যায়ে রয়েছে ইরান। দুই দেশের মধ্যে প্রাথমিক সমঝোতা সম্পন্ন হওয়ার পর এখন কিছু অমীমাংসিত বিষয় পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এই চুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে পারস্য উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজগুলোর ওপর ইরানের বড় ধরনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হবে এবং তেহরান জাহাজগুলো থেকে সেবা ফি বা টোল আদায়ের সুযোগ পাবে। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, শিগগিরই এই ঐতিহাসিক চুক্তির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে।
হরমুজ প্রণালির ওপর এই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা তেহরানের জন্য একটি বড় কৌশলগত ও অর্থনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রায় পাঁচ মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের পর এটি আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যে ইরানের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে এই জলপথে জাহাজ চলাচলের ওপর তেহরানের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না এবং কোনো সেবা ফিও নেওয়া হতো না। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে রেখেছিল ইরান, যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি পরিবাহিত হতো। এতে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলে প্রণালিটি চালু করতে মরিয়া হয়ে ওঠেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
গত বুধবার রাতে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই ওমানের সঙ্গে এই প্রাথমিক ঐকমত্যের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, চুক্তিটির চূড়ান্ত পর্যালোচনা চলছে। এছাড়া ইরানের পররাষ্ট্র উপমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি স্পষ্ট করেছেন যে, সমঝোতা অনুযায়ী পারস্য উপসাগরে জাহাজ প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ তেহরানই নিয়ন্ত্রণ করবে। তেহরানে অবস্থানরত আল-জাজিরার সাংবাদিক তোহিদ আসাদি কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানিয়েছেন, দু-একটি অমীমাংসিত বিষয় থাকলেও সেগুলো খুব জটিল নয় এবং বৃহস্পতিবারের শেষ নাগাদ চুক্তির ঘোষণা আসতে পারে।
খসড়া চুক্তির বিষয়ে কিংস কলেজ লন্ডনের শিক্ষক রব জেইস্ট পিনফোল্ড জানিয়েছেন, নতুন সমঝোতা অনুযায়ী হরমুজে দুটি পথ থাকবে—একটি ইরানের এবং অন্যটি ওমানের উপকূল দিয়ে। তবে যুদ্ধের আগে ব্যবহৃত মাঝবরাবর পথের তুলনায় এই নতুন পথ দিয়ে সমপরিমাণ জাহাজ চলাচল সম্ভব নয় এবং এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজের ওপর ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকলেও, বের হয়ে যাওয়া জাহাজগুলোর ওপর তেহরানের ভূমিকা কী হবে তা নিয়ে এখনো পর্যালোচনা চলছে। এছাড়া সেবা ফি নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে; ইরান পণ্যের মূল্যের ৫ থেকে ৭ শতাংশ ফি দাবি করলেও ওমান তা ৩ শতাংশে নামিয়ে আনতে আলোচনা করছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো ধরনের টোল বা ফির ঘোর বিরোধিতা করছে।
হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন এবং গত জুলাই মাসে ইরানে ব্যাপক হামলাও চালিয়েছিল মার্কিন বাহিনী। তবে তেহরান তাদের অবস্থান থেকে পিছু হঠেনি। এই দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় ওয়াশিংটনকে যুক্ত করা হয়নি এবং সমঝোতার খবর আসার পর যুক্তরাষ্ট্র হরমুজে ইরানের নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত বুধবার হুমকি দিয়ে বলেছেন, চুক্তি না করলে ইরানে কঠোর হামলা চালানো হবে। এর জবাবে বৃহস্পতিবার ইরানের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমির আকরামিনিয়া বলেছেন, যেকোনো হুমকির জবাব দিতে ইরান পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে।
আল-জাজিরার সাংবাদিক মাহমুদ আবদেল ওয়াহেদ মন্তব্য করেছেন যে, এই চুক্তি হলেও সংকটের পুরোপুরি অবসান নাও হতে পারে। কারণ হিসেবে তিনি হরমুজে টোল আদায়ে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি, ওয়াশিংটনের চলমান নৌ অবরোধ এবং যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধে তেহরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনার কোনো অগ্রগতি না হওয়াকে চিহ্নিত করেছেন।