কুষ্টিয়া সদর আসনে একসময় ছিল প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুব-উল আলম হানিফের রাজত্ব। গত ১৭ বছর এই আসনে হানিফই ছিলেন শেষকথা। তার ভাই আতাউর রহমান আতাকে দিয়ে শাসন করতেন গড়াই নদীর তীরবর্তী এই জেলাটি। ৫ই আগস্টের পর কুষ্টিয়ার রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলে গেলে হানিফ ও আতা এলাকা ছাড়েন। এরপর থেকেই মূলত আমির হামজা ও তার অনুসারী জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা কুষ্টিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি আমির হামজার কটূক্তির প্রতিবাদে আয়োজিত এক সমাবেশকে কেন্দ্র করে গণঅধিকার পরিষদের কার্যালয়ে তাণ্ডব চালানোর ঘটনা ঘটে। গত ১৫ই আগস্ট বিকালে শহরের ছয়রাস্তা মোড়ে গণঅধিকার সভাপতি নুরুল হক নুর ও দলটির সাবেক নেতা রাশেদ খানকে নিয়ে আমির হামজার কটূক্তির প্রতিবাদে সমাবেশের আয়োজন করেছিল দলটি। সমাবেশ শেষে গণঅধিকার নেতাকর্মীদের সঙ্গে জামায়াত-শিবির কর্মীদের সংঘর্ষ বাঁধে। এক পর্যায়ে সন্ধ্যার পর বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে ৭০-৮০ জন নেতাকর্মী ধারালো অস্ত্র ও লাঠিসোটা নিয়ে গণঅধিকারের জেলা কার্যালয়ে হামলা চালায়। এ সময় কার্যালয়ের কম্পিউটার, এসি, আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয় এবং জেলা সাধারণ সম্পাদক আবদুল খালেকের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও হামলা চালিয়ে কর্মচারীদের মারধর করা হয়।
এই ঘটনার পর থেকে গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীরা হামলার ভয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। কুষ্টিয়া ছাত্র অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আহমেদ সবুজ ও সদর উপজেলা সভাপতি খন্দকার হাদিউর রহমান তনয়সহ একাধিক নেতাকর্মী জানিয়েছেন, তারা শিবিরকর্মীদের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত হুমকি পাচ্ছেন। হামলায় আহতদের মধ্যে সোহান আহমেদ তুফানের নাকের হাড় ও হাত ভেঙে গেছে এবং মুহাদ্দিস নামে আরেক নেতাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম করা হয়েছে।
নিজের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও বক্তব্যের বিষয়ে আমির হামজা বলেন, গণঅধিকারের কার্যালয়ে হামলার ঘটনাটি অনাকাঙ্ক্ষিত এবং আমার অজান্তেই তা ঘটেছে। গত ১৬ই আগস্ট কুষ্টিয়ায় এক প্রতিবাদ সমাবেশে আমির হামজা বলেছিলেন, কুষ্টিয়া সদর আসনে আগামী পাঁচ বছর আমিই প্রধানমন্ত্রী। ডিসি, এসপি, ইউএনও নিরপেক্ষ না হলে কুষ্টিয়া থেকে তাদের বিদায় করে দেয়ার হুঁশিয়ারি দেন তিনি। এছাড়া আরেক বক্তৃতায় আমির হামজা দাবি করেছিলেন তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু জাবি প্রশাসন জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১১ সালে জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ চালু হয়। এসব বিষয়ে তিনি বিতর্কিত হয়ে পড়েছেন। নিজের গাড়িতে দেশীয় অস্ত্র বহনের বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, নিরাপত্তার খাতিরেই তিনি বেসবল খেলার দণ্ড সাথে রাখেন।
এদিকে কুষ্টিয়া বিএনপি’র চার গ্রুপে বিভক্ত থাকলেও দলটির নেতাকর্মীদের শহরে শক্ত অবস্থান রয়েছে। জেলা বিএনপি’র সদস্য সচিব জাকির হোসেনের মতে, কুষ্টিয়া সদর আসনে বিএনপি’র ঘাঁটিতে ৬৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজয়ের নেপথ্যে চারটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে নির্বাচনের আগে কুষ্টিয়া ডিসি-এসপিসহ পুরো প্রশাসন জামায়াতপন্থিদের দিয়ে সাজানো হয়েছিল এবং বিএনপি’র একটি গ্রুপ দলের বিপক্ষে কাজ করেছে। এছাড়া ২৪ জন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা ও ৩০টি পয়েন্টে নজরদারি ছিল। তিনি দাবি করেন, কুষ্টিয়ায় প্রশাসনের জামায়াতপন্থি সাজসজ্জা এবং বিএনপি’র অভ্যন্তরীণ গ্রুপিংয়ের কারণেই নির্বাচনে পরাজয় হয়েছে।