ভেনেজুয়েলার বিশাল জ্বালানি তেল ভান্ডারের একটি বড় অংশের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটির প্রমাণিত তেলের বড় একটি অংশ ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণে নিতে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে একটি চুক্তি সই হয়েছে। এই চুক্তির আওতায় ভেনেজুয়েলার ১৭টি কৌশলগত তেলক্ষেত্র অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যেখান থেকে আগামী ১০০ বছর তেল উত্তোলনের সুযোগ পাবে যুক্তরাষ্ট্র।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘোষণা অনুযায়ী, এই চুক্তির মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার ৬ হাজার ৫০০ কোটি ব্যারেলের বেশি প্রমাণিত জ্বালানি তেলের ওপর ‘সবচেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণ’ পাবে যুক্তরাষ্ট্র। এই পরিমাণটি ভেনেজুয়েলার মোট প্রমাণিত মজুতের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের এক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সাল পর্যন্ত ভেনেজুয়েলায় ৩০ হাজার ৩০০ কোটি ব্যারেল জ্বালানি তেল মজুত ছিল, যা বিশ্বে জ্বালানি তেলের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত মজুত। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল মজুতের প্রায় ১৭ শতাংশ ভেনেজুয়েলায় রয়েছে বলেও ধারণা করা হয়। তবে এই চুক্তির বিস্তারিত শর্ত এখনো প্রকাশ না করায় বিশ্লেষকদের কেউ কেউ ট্রাম্পের দাবি করা তেলের পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। জ্বালানি বাজার গবেষক রোরি জনস্টন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ৬ হাজার ৫০০ কোটি ব্যারেলের এই সংখ্যাটি বিভ্রান্তিকর এবং চুক্তির মূল শর্তগুলো এখনো অজানা। তাঁর মতে, ট্রাম্প মূলত মার্কিন অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার বার্তা দিতে এবং নিজের প্রচারণায় ব্যবহারের জন্য এই সংখ্যাটিকে বড় করে দেখাচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব জ্বালানি তেলের মজুত ১৯৮২ সালের পর বর্তমানে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ দেশটির প্রমাণিত তেলের মজুত ছিল প্রায় ৪ হাজার ৬০০ কোটি ব্যারেল। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সংরক্ষিত ‘স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ’ (এসপিআর)-এর ধারণক্ষমতা ৭১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল হলেও বর্তমানে সেখানে মাত্র ২৮ কোটি ৯৭ লাখ ব্যারেল তেল রয়েছে। ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভেনেজুয়েলার সঙ্গে হওয়া এই চুক্তি মার্কিন জ্বালানি তেলের সংকট দূর করে মজুত পুনরুদ্ধার করতে বড় ভূমিকা রাখবে।
২০২৬ সালের শুরুতে ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সম্পর্কে বড় ধরনের নাটকীয় পরিবর্তন আসে। ২০১৩ সাল থেকে সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিবিদ নিকোলা মাদুরো ভেনেজুয়েলা শাসন করছিলেন, যাঁর বিরুদ্ধে বিতর্কিত নির্বাচন ও রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ রয়েছে। ট্রাম্প ও মাদুরোর দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে গত ৩ জানুয়ারি ট্রাম্পের অনুমোদনে চালানো এক বিশেষ অভিযানে মাদুরোকে আটক করা হয়। ২১০০ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে মাদুরোকে নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তিনি এখন মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানের অভিযোগে বিচারের অপেক্ষায় আছেন। মাদুরোর পতনের পর তাঁর সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজকে কারাকাসের অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে সমর্থন দেয় ওয়াশিংটন। সমালোচকদের দাবি, মার্কিন প্রশাসন নিজেদের দাবি পূরণে রাজি করাতে রদ্রিগেজের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছে।
ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজও এই চুক্তিকে তাঁর দেশের জন্য ‘ঐতিহাসিক’ সাফল্য হিসেবে দাবি করেছেন। ২০১৪ সাল থেকে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও তীব্র আর্থিক সংকটে জর্জরিত ভেনেজুয়েলা থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দেশ ছেড়েছেন। সমালোচকেরা এই আর্থিক সংকটের জন্য সরকারের লাগামহীন দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় শিল্প খাতের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেন। রদ্রিগেজ আশা করছেন, এই চুক্তি থেকে ভেনেজুয়েলা ২০ হাজার ৯০০ কোটি ডলার কর পাবে এবং প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলারের নতুন বিনিয়োগ আসবে, যা দেশের হাইড্রোকার্বন শিল্প ও অবকাঠামো পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখবে। তবে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এই সুবিধার বিনিময়ে রদ্রিগেজের সরকার যুক্তরাষ্ট্রকে ১০০ বছরের জন্য ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ ব্যবহারের অধিকার দিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম অনেক বেড়ে গেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর ইরান বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতি গ্যালন পেট্রলের দাম ৪ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটারদের জীবনযাত্রার ব্যয় সংক্রান্ত উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণকে ট্রাম্প প্রশাসন মার্কিন অর্থনীতির জন্য বড় জয় হিসেবে দেখছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই চুক্তিকে ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির বড় সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সমালোচকেরা এই চুক্তিকে ভেনেজুয়েলার জাতীয় সম্পদ দখলের একটি নগ্ন প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। ট্রাম্প ও তাঁর উপদেষ্টারা দাবি করেন, ভেনেজুয়েলা অতীতে মার্কিন কোম্পানির তেলক্ষেত্র জাতীয়করণ করে ‘সম্পদ চুরি’ করেছিল। ট্রাম্পের উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার একে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ চুরির সবচেয়ে বড় ঘটনা বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। অন্যদিকে, জ্বালানি বিশ্লেষক গ্রেগরি ব্রিউ এই ঘটনাকে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ইরাক ও ইরানের তেল সম্পদ দখলের চেষ্টার সঙ্গে তুলনা করেছেন। ট্রাম্প নিজেও ঔপনিবেশিক যুগের ‘ম্যানিফেস্ট ডেসটিনি’ বা ভূখণ্ড ও সম্পদ সম্প্রসারণের নীতিকে প্রকাশ্যে সমর্থন করছেন, যা লাতিন আমেরিকায় মার্কিন আধিপত্য বিস্তারের দীর্ঘ ইতিহাসেরই ধারাবাহিকতা।