প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম (02-09-2026, 12:00 AM)
থানা, আদালত প্রাঙ্গণ কিংবা পুলিশের কঠোর নিরাপত্তা বলয় ভেদ করে একের পর এক আসামি পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। সম্প্রতি রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানার একটি হত্যা মামলায় তিন দিনের রিমান্ডে থাকা মিতু আক্তার নামে এক নারী আসামি পুলিশ হেফাজত থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর এই আলোচনা নতুন করে সামনে এসেছে। চলতি বছর মিতু ছাড়াও আরও অন্তত সাতজন দুর্ধর্ষ আসামি পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে গেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজত থেকে এভাবে আসামি পলায়নের তথ্য সাধারণত চেপে যাওয়ার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এমনকি police সদর দপ্তরের কাছে এ সংক্রান্ত তথ্য চেয়েও পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে বিভিন্ন মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত চার বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আসামি পলায়নের ঘটনা ঘটেছে ২০২৫ সালে, যে বছর দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অন্তত ১২ জন আসামি পালিয়ে যায়। এছাড়া ২০২৪ সালে ৫ জন এবং ২০২৩ সালে ৪ জন আসামি পুলিশি হেফাজত থেকে পালাতে সক্ষম হয়। যদিও পালিয়ে যাওয়া কিছু আসামিকে পরবর্তীতে পুনরায় গ্রেফতার করা হলেও এর সঠিক পরিসংখ্যান জানাতে পারেনি পুলিশ।
আসামিদের এভাবে নিরাপত্তা জাল ছিন্ন করে পালিয়ে যাওয়ার নেপথ্য কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আদালত বা কারাগার থেকে প্রিজনভ্যানে আসামিদের ওঠানো-নামানোর সময় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ফাঁকফোকর থেকে যায়। আসামিরা মূলত এই দুর্বল মুহূর্তটিরই সুযোগ নেয়। এছাড়া আসামিদের নজরদারিতে রাখার জন্য পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্যের অভাব, হাতকড়া পরাতে অবহেলা বা নিরাপত্তা সরঞ্জামের সঠিক ব্যবহার না করা, জনাকীর্ণ স্থানে আসামি নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা এবং দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের অসতর্কতাও এর জন্য দায়ী। অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে যে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পালিয়ে যাওয়া আসামির সঙ্গে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের যোগসাজশ বা আঁতাতের অভিযোগও রয়েছে। পাশাপাশি থানা পুলিশ, আদালত পুলিশ এবং কারা কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবও এ ধরনের ঘটনার পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করছে।
হেফাজত থেকে আসামি পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে সাময়িক বরখাস্ত বা বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও এই প্রবণতা ঠেকানো যাচ্ছে না। অনেকেই একে 'সর্ষের ভেতর ভূত' থাকার মতো পরিস্থিতি হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হেফাজতে থাকা আসামির পালিয়ে যাওয়া কেবল সংশ্লিষ্ট মামলার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়াকেই ব্যাহত করে না, বরং এটি পুরো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তা ও জবাবদিহিতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। বিশেষ করে হত্যা, ডাকাতি বা মাদক মামলার মতো গুরুতর অপরাধের আসামিরা পালিয়ে গেলে মামলার বাদী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়ে। তাই শুধু কয়েকজন সদস্যকে প্রত্যাহার বা শাস্তি দেওয়াই সমাধান নয়, বরং প্রতিটি ঘটনার গভীরে গিয়ে নিরাপত্তা প্রটোকল নতুন করে মূল্যায়ন করা জরুরি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক এ বিষয়ে বলেন, হেফাজত থেকে আসামি পলায়নের পেছনে মূলত দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, আসামিকে সুরক্ষিত হেফাজতে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, পেশাদারিত্ব ও দক্ষতার অভাব। দ্বিতীয়ত, দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও আসামির সঙ্গে পুলিশের কোনো কোনো সদস্যের অনৈতিক যোগসাজশ। তিনি সতর্ক করে বলেন, এভাবে পলায়নের ঘটনা বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে প্রভাবশালী বা পেশাদার অপরাধীদের হেফাজতে রাখা পুলিশের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। এছাড়া যখন কোনো সাক্ষী জানবে যে আসামি পালিয়ে গেছে, তখন সে নিজের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে সাক্ষ্য দিতে ভয় পাবে, যা বিচার ব্যবস্থাকে বাধাগ্রস্ত করবে। তাই পুলিশকে অভ্যন্তরীণভাবে প্রতিটি ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
এদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন জানান, হেফাজত থেকে আসামি পলায়নের প্রতিটি ঘটনা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। নিরাপত্তার ঘাটতি ও দায়িত্বে অবহেলার বিষয়গুলো চিহ্নিত করে হেফাজতের নিরাপত্তা জোরদার, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং নিয়মিত তদারকি বাড়ানো হয়েছে। দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।