বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলসীমায় প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমার দীর্ঘ সময় ধরে বাণিজ্যিকভাবে তেল-গ্যাস উত্তোলন করলেও বাংলাদেশ এখনো অনুসন্ধান কাজই শুরু করতে পারেনি। মিয়ানমার ২০১৪ সাল থেকে তাদের সমুদ্রসীমা থেকে গ্যাস উত্তোলন করে চীনে রপ্তানি করছে। চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ এখন উল্টো মিয়ানমারের কাছ থেকেই গ্যাস পাওয়ার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে ভারত প্রায় দুই দশক আগে অগভীর সমুদ্রে অনুসন্ধান ও বাণিজ্যিক উত্তোলন শুরু করে বর্তমানে কৃষ্ণা-গোদাবরী বেসিন এবং পূর্ব উপকূলীয় গভীর সমুদ্রে কার্যক্রম আরও জোরদার করেছে। দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ওএনজিসি অন্ধ্র উপকূল থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাসের বড় মজুতও আবিষ্কার করেছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভূতত্ত্ববিদদের মতে, ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের পর সমুদ্রজয়ের যে প্রচারণা চালানো হয়েছিল, তার পেছনে ছিল বড় ধরনের শুভঙ্করের ফাঁকি। মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধের রায়ে বাংলাদেশ মূলত হেরে গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম জানান, আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের কারণে বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্ত-সংলগ্ন প্রায় সব গ্যাস ব্লক হারিয়েছে। গভীর সমুদ্রের ১৩, ১৮, ২২, ২৩, ২৬, ২৭ ও ২৮ নম্বর ব্লকসহ মোট আটটি সম্ভাবনাময় ব্লক মিয়ানমারের সীমানায় যুক্ত হয়েছে, যার সম্মিলিত আয়তন প্রায় ২১ হাজার ৩০০ বর্গকিলোমিটার। তৎকালীন সরকারি মহলের পৃষ্ঠপোষকতায় দেশজুড়ে সমুদ্র বিজয় উৎসবের আড়ম্বরে এই বিপুল পরিমাণ ব্লক হারানোর বিষয়টি ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে বাংলাদেশের অধীনে থাকা সমুদ্রসীমাকে ২৬টি ব্লকে বিভক্ত করে পেট্রোবাংলা, যার মধ্যে ১৫টি গভীর সমুদ্রে এবং ১১টি অগভীর সমুদ্রে অবস্থিত।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিবেশী দেশগুলো সমুদ্রে খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানে অভাবনীয় সাফল্য পেলেও বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার মূল কারণ রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্ত। এছাড়া তথ্য-উপাত্তের অভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে ব্যর্থতা এবং নিজস্ব অনুসন্ধান সক্ষমতার ঘাটতি বঙ্গোপসাগরের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মেরিটাইম বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের দুর্বল নীতি ও কার্যকর উদ্যোগের অভাবে এতদিন বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা থেকে ভারত ও মিয়ানমারের জেলেরা জোর করে মাছ ধরে নিয়ে গেছে। তবে বর্তমান সরকারের নীতিনির্ধারকরা জানিয়েছেন, এবার সমুদ্রসীমার সম্পদ পুরোপুরি কাজে লাগাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৪ সালে বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের প্রথম কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে বছর ‘পিএসসি ১৯৯৪’-এর আওতায় বহুজাতিক কোম্পানি কেয়ার্ন এনার্জি ও শেলের সমন্বয়ে গঠিত জয়েন্ট ভেঞ্চার এবং পরবর্তীতে স্যান্টোসের সঙ্গে ১৫ ও ১৬ নম্বর ব্লকের জন্য চুক্তি হয়। ১৫ নম্বর ব্লকে কোনো গ্যাস না পাওয়া গেলেও চট্টগ্রামের সলিমপুর উপকূল থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে ১৬ নম্বর ব্লকে সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়। ১৯৯৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত এই সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলন করা হয় এবং মজুত ফুরিয়ে যাওয়ায় ২০১৩ সালে এটি বন্ধ হয়ে যায়।
এরপর ‘মডেল পিএসসি ২০০৮’-এর অধীনে গভীর সমুদ্রের ডিএস-১০ ও ডিএস-১১ ব্লকের জন্য মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি কনোকোফিলিপসের সঙ্গে চুক্তি করেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু ২০১৫ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে লভ্যাংশ বণ্টন নিয়ে বনিবনা না হওয়ায় তারা ব্লক দুটি ছেড়ে চলে যায়। একইভাবে ‘মডেল পিএসসি ২০১২’-এর আওতায় অগভীর সমুদ্রের এসএস-১১ ব্লকের জন্য স্যান্টোসের সঙ্গে চুক্তি হলেও ২০২০ সালে তারাও কাজ ছেড়ে চলে যায়।
মার্কিন কোম্পানিকে বিদায় দেওয়ার পর ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি ওএনজিসি-কে দুটি ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয়। চুক্তি করার পাঁচ বছর পর ২০১৯ সালে ওএনজিসি কাজ শুরু করলেও একটি কূপে গ্যাস না পাওয়ায় এবং অন্য কূপটি খনন না করেই চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৮ সাল থেকে সরকার এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়। পরবর্তীতে ২০২৩ সালে আরেকটি মডেল পিএসসি করা হলে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি এক্সনমবিল গভীর সমুদ্রের ১৫টি ব্লকে গ্যাস অনুসন্ধানের প্রস্তাব দিলেও তৎকালীন সরকার তা প্রত্যাখ্যান করে।
তবে বর্তমান নীতিনির্ধারকরা জানিয়েছেন, বঙ্গোপসাগরে তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানে এবার বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করতে নানা ধরনের প্রণোদনাসহ আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। দরপত্র কেনা ও জমা দেওয়ার সময়সীমা আগামী ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে পেট্রোবাংলা ৫৫টি আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে ইমেইলের মাধ্যমে দরপত্রে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে। ভূ-তত্ত্ববিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন, এবার কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের বিপুল সম্পদ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় অবদান রাখবে।