প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫: ২৫
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুতগতির উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণে তিন দফা পরিকল্পনা দিয়ে এই প্রযুক্তির বিকাশের গতি কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) দারিও আমোদেই। এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে নিজের প্রস্তাবিত পরিকল্পনার প্রথম ধাপটি বাস্তবায়নে তার প্রতিষ্ঠান একতরফাভাবে কাজ করবে বলেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের লেখা ‘উই মাস্ট পেস দ্য ফ্রন্টিয়ার’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধের লিংক শেয়ার করে এই প্রস্তাব তুলে ধরেন আমোদেই। সেখানে তিনি এআই ব্যবস্থার নিরাপত্তা যাচাইয়ের জন্য তৃতীয় পক্ষের স্বাধীন মূল্যায়নকারীদের স্থায়ীভাবে অ্যানথ্রপিকের সিস্টেমে কর্মীদের মতো প্রবেশাধিকার দেওয়ার কথা বলেন। এই মূল্যায়নকারীরা প্রশিক্ষণ চলাকালে এআই মডেলের অ্যালাইনমেন্ট পরীক্ষা করবেন, নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করবেন এবং যেকোনো ঘটনার প্রতিবেদন তৈরি করবেন।
অ্যানথ্রপিকের সাবেক গবেষক জ্যাকব কক্সনের সাম্প্রতিক এক হুঁশিয়ারির পরই আমোদেইর এই বক্তব্য সামনে এলো। কক্সন সতর্ক করে বলেছিলেন, ২০৩০ সালের মধ্যেই এআই মানবসভ্যতার বিলুপ্তির কারণ হতে পারে। দায়িত্বশীলতার অভাব এবং স্ব-উন্নয়নশীল সুপারইন্টেলিজেন্সের দিকে অতিরিক্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআইয়ের চাকরি ছেড়েছেন বলে গত বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান।
কক্সনের এই অভিযোগের জবাবে গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক বিবৃতিতে অ্যানথ্রপিকের মুখপাত্র বলেন, এআই প্রযুক্তির বিপুল সুবিধার পাশাপাশি যে নজিরবিহীন ঝুঁকি রয়েছে, সে বিষয়ে তাদের প্রতিষ্ঠান শুরু থেকেই স্বচ্ছ। বর্তমানে তারা এই খাতের অন্যতম শক্তিশালী নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করে মডেল তৈরির কাজ করছেন।
এদিকে দারিও আমোদেইর এই প্রস্তাবকে সমর্থন জানিয়েছেন ওপেনএআইয়ের সিইও স্যাম অল্টম্যান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি বলেন, এআইয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধির গতি নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। স্বাধীন মূল্যায়নকারীদের কর্মীদের মতো প্রবেশাধিকার দেওয়ার আইডিয়াটিকে দারুণ উল্লেখ করে ওপেনএআইও এই পথ অনুসরণ করবে বলে জানান তিনি। প্রযুক্তি খাতের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ইলন মাস্কও আমোদেইর সঙ্গে একমত পোষণ করে লিখেছেন, ‘দারিও ঠিক বলেছেন।’ এছাড়া ওপেনএআইয়ের গবেষক এইডেন ম্যাকলাফলিনও এই প্রস্তাবের সঙ্গে প্রায় পুরোপুরি সহমত প্রকাশ করেছেন।
এর আগে চলতি বছরের শুরুতে ‘দ্য অ্যাডোলেসেন্স অব টেকনোলজি’ নামের আরেকটি দীর্ঘ প্রবন্ধে প্রযুক্তিটির দ্রুত বিকাশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন আমোদেই। নতুন প্রবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, সতর্কভাবে ব্যবহার করা গেলে এআই মানুষের জীবনযাত্রার মান অনেক উন্নত করতে পারে। তবে বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার কারণে প্রযুক্তির উন্নয়নের যে অন্ধ দৌড় চলছে, তা এর ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই শুধু নিরাপত্তায় বিনিয়োগ করাই যথেষ্ট নয়, বরং সক্ষমতা বৃদ্ধির গতি এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে যেন নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার সময় পায়।
আমোদেই জানান, গত গ্রীষ্মে এআইয়ের সক্ষমতা ‘রিকার্সিভ সেলফ-ইমপ্রুভমেন্ট’ বা স্ব-উন্নয়নের পুনরাবৃত্তিমূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে বেড়েছে। এটি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চললে তা মানুষের বোঝার ও নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। উদাহরণ হিসেবে তিনি সম্প্রতি হাগিং ফেসকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন, যেখানে ওপেনএআইয়ের তৈরি একদল এআই এজেন্ট কোনো নির্দেশনা ছাড়াই একটি সাইবার নিরাপত্তা অভিযান পরিচালনা করেছিল। ওই ঘটনায় বড় কোনো ক্ষতি না হলেও, আরও শক্তিশালী এআই মডেলের ক্ষেত্রে এমন অসামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
ঝুঁকি মোকাবিলায় আমোদেইর দেওয়া তিন দফা পরিকল্পনার প্রথম ধাপে রয়েছে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো ভারসাম্যপূর্ণ গতিতে প্রযুক্তির উন্নয়ন করা এবং তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে তা যাচাই করা। দ্বিতীয় ধাপে পুরো শিল্পখাতে সমন্বয় এবং তৃতীয় ধাপে বৈশ্বিক সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, এই ধাপগুলো ধারাবাহিকভাবেই বাস্তবায়ন করতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এআইয়ের নিরাপদ উন্নয়ন নিশ্চিত করা সহজ হবে না স্বীকার করেও মানবতার স্বার্থে এই পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করেন অ্যানথ্রপিকের এই প্রধান নির্বাহী।