১৫ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে জাতিসংঘ ঘোষিত ‘আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস’। ২০০৮ সাল থেকে নিয়মিত উদযাপিত হওয়া এই দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘মানবাধিকারকে কেন্দ্রবিন্দুতে আনা’। বাংলাদেশে এমন এক সময়ে দিবসটি এসেছে, যখন মানবাধিকার কমিশন আইন এবং গুমের প্রতিকার ও বিচার-সংক্রান্ত আইন পাস নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানামুখী বিতর্ক ও সমালোচনা চলছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিবাদের মুখেই জাতীয় সংসদের সদ্য সমাপ্ত অধিবেশনে মানবাধিকার কমিশন আইনটি পাস হয়। একই সঙ্গে পাস হওয়া গুমের প্রতিকার ও বিচার-সংক্রান্ত আইনটিকেও দুর্বল করে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে বিরোধী দল ও বিশিষ্ট নাগরিক সমাজ। মূলত গণতন্ত্র, গণমাধ্যম ও মানবাধিকার যে একে অপরের পরিপূরক, সেই সত্যটিই এ বছর আবারও সামনে এসেছে।
দিবসটির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৮৮ সালে ফিলিপাইনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট কোরাজন একুইনো স্বৈরশাসন থেকে মুক্ত হওয়া রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে ‘ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন নিউ অ্যান্ড রেস্টোরড ডেমোক্রেসি’ (আইসিএনআরডি) নামক একটি সম্মেলনের আয়োজন করেন। সেই সম্মেলনে নতুন গণতন্ত্র পাওয়া দেশগুলোর শাসনব্যবস্থা সংহতকরণের লক্ষ্যে কিছু প্রস্তাব গৃহীত হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৯৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের আন্তঃসংসদীয় ইউনিয়ন (আইপিইউ) ‘ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অন ডেমোক্রেসি’ শিরোনামে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। এর ঠিক ১০ বছর পর, ২০০৭ সালের ৮ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬২তম অধিবেশনের ৭ নম্বর রেজল্যুশনে প্রতিবছর ১৫ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস হিসেবে পালনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
জাতিসংঘ এবার মানবাধিকারকে কেন্দ্রে রাখার বিষয়টি নির্ধারণ করে মূলত বিশ্বসংস্থাটি ঘোষিত মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র বাস্তবায়নের ওপর জোর দিতে চেয়েছে। এই সনদের প্রথম ও দ্বিতীয় ধারায় সব মানুষের স্বাধীন জন্মগত মর্যাদা, ভ্রাতৃত্বসুলভ আচরণ এবং বর্ণ, ধর্ম, ভাষা বা রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া ৩ থেকে ১২ নম্বর ধারাগুলোতে মানুষের জীবন ও দৈহিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দাসপ্রথা ও নির্যাতন নিষিদ্ধকরণ, আইনের চোখে সমতা, খেয়ালখুশিমতো গ্রেপ্তার বা নির্বাসন না দেওয়া, স্বাধীন আদালতে প্রকাশ্য শুনানি এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার মতো মৌলিক অধিকারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তবে তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশে এই অধিকারগুলো এখনো চরমভাবে খর্ব হতে দেখা যায়, যেখানে মানুষ ন্যূনতম সভা-সমাবেশ বা কথা বলার অধিকার পেলেই নিজেদের ধন্য মনে করে।
দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরশাসনের নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ বর্তমানে একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হলেও ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে বিতর্ক রয়ে গেছে। অতি সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে জাতীয় ছাত্রশক্তির প্রথম কাউন্সিলে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন যে, গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন না করে বিএনপি সরকার অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দেশ চালাচ্ছে। তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দখলদারিত্ব ও গণরুম-গেস্টরুম সংস্কৃতির উদাহরণ টেনে এই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। একইভাবে সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানও সরকারের বিরুদ্ধে অগণতান্ত্রিক আচরণ ও সর্বত্র দলীয়করণের অভিযোগ তুলছেন।
অবশ্য এই অভিযোগের বিপরীতে দেশের বর্তমান বাস্তবতায় কিছু ইতিবাচক চিত্রও দৃশ্যমান। বর্তমানে বিরোধী দলগুলো স্বাধীনভাবে সভা-সমাবেশ করতে পারছে এবং সংসদে সরকারের তীব্র সমালোচনা করার সুযোগ পাচ্ছে। গণমাধ্যমও কোনো বড় ধরনের বাধা ছাড়াই স্বাধীনভাবে সাংবাদিকতা করছে, এমনকি মন্ত্রীদের ক্ষমতার অপব্যবহারও জনগণের সামনে তুলে ধরছে। তবে সামাজিক অপশক্তি ও প্রভাবশালীদের হাতে সাংবাদিকদের হেনস্তা হওয়ার ঘটনা এখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে দীর্ঘ ১৭ বছর প্রবাসে থেকে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন এবং তার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াও গণতন্ত্রের জন্য চরম নিপীড়ন সহ্য করেছেন। ফলে তার শাসনামলে গণতন্ত্র শৃঙ্খলিত হবে না বলেই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা। সাত মাসের শাসনে তিনি বারবার গঠনমূলক সমালোচনাকে স্বাগত জানানোর কথা বলেছেন, যদিও সম্প্রতি সংসদের সমাপনী ভাষণে তিনি বাক্স্বাধীনতার সীমার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
ক্ষমতার বাইরে থাকাকালীন ২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বিবৃতিতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমান বলেছিলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এক ভয়ংকর স্বৈরশাসনের পতনের পর ঐক্যবদ্ধভাবে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন, বিচার বিভাগ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং মানবিক মর্যাদা ও সাম্যের ভিত্তিতেই রাষ্ট্র মেরামত করা সম্ভব। ক্ষমতার বাইরে থাকা তারেক রহমানের সেই গণতান্ত্রিক দর্শন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও তিনি বজায় রাখবেন এবং সব ধরনের অগণতান্ত্রিক অভিযোগের অবসান ঘটিয়ে দেশে গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখবেন—এটাই এখন দেশবাসীর মূল প্রত্যাশা।