১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (2026) তারিখে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের সব সিটি করপোরেশনের জনবল নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষমতা সংকুচিত করে একটি নতুন অফিস আদেশ জারি করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও অর্থ বিভাগের নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা হয়েছে। তবে গেজেটভুক্ত চাকরি বিধিমালা সংশোধন না করে কেবল একটি সাধারণ অফিস আদেশের মাধ্যমে এই পরিবর্তন আনায় এর আইনগত বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গত ১২ আগস্ট জারি করা এই অফিস আদেশ অনুযায়ী, সিটি করপোরেশনগুলোর ৭ম থেকে ২০তম গ্রেডের পদে নিয়োগ ও পদোন্নতির জন্য দুটি পৃথক বাছাই কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭ম থেকে ১০ম গ্রেডের পদের জন্য গঠিত ‘বাছাই কমিটি-১’-এর আহ্বায়ক করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের মেয়র বা প্রশাসককে। এই কমিটিতে সদস্য হিসেবে থাকবেন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং স্থানীয় সরকার বিভাগ, অর্থ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা। কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের সচিব।
অন্যদিকে, ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের পদের জন্য ‘বাছাই কমিটি-২’ গঠন করা হয়েছে, যার আহ্বায়ক করা হয়েছে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে। এই কমিটিতেও স্থানীয় সরকার বিভাগ, অর্থ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি রাখা হয়েছে। এছাড়া, ৪র্থ, ৫ম ও 6ষ্ঠ গ্রেডের পদে নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪-এর একটি পরিপত্র অনুযায়ী কেন্দ্রীয় বাছাই কমিটির সিদ্ধান্ত অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওই পরিপত্রে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কেবল সেসব পদই কেন্দ্রীয় কমিটির আওতায় আসবে, যার নিয়োগ বা পদোন্নতির দায়িত্ব আইন বা বিধি অনুযায়ী সরকারের ওপর ন্যস্ত। কিন্তু সিটি করপোরেশনগুলোর নিজস্ব চাকরি বিধিমালায় ভিন্ন বিধান রয়েছে। যেমন, ২০১৯ সালের ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) কর্মচারী চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী, করপোরেশন নিজেই নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ। সরাসরি নিয়োগ বা পদোন্নতির জন্য করপোরেশনের নিজস্ব বাছাই কমিটির সুপারিশের বিধান রয়েছে। ফলে ৪র্থ থেকে ৬ষ্ঠ গ্রেডের পদগুলোকে কেন্দ্রীয় কমিটির অধীনে নেওয়ার আইনি ভিত্তি নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
ঢাকা উত্তর ছাড়াও ঢাকা দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের চাকরি বিধিমালা ২০১৯ সালে, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২০২০ সালে এবং বরিশাল, রাজশাহী, খুলনা, গাজীপুর ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের চাকরি বিধিমালা বিভিন্ন সময়ে সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হয়েছে। স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন-২০০৯-এর আওতায় প্রণীত এই বিধিমালাগুলো বিধিবদ্ধ দলিল হওয়ায় সাধারণ প্রশাসনিক আদেশ দিয়ে এগুলো পরিবর্তন বা অকার্যকর করা যায় না। বিধিমালা পরিবর্তন করতে হলে আইনি প্রক্রিয়ায় সংশোধন করে তা পুনরায় গেজেটে প্রকাশ করতে হবে। যদিও সিটি করপোরেশন আইনের ১০৫ ধারায় সরকারকে নির্দেশনা দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তবে তা বিদ্যমান আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। প্রশাসনিক নির্দেশ ও গেজেটভুক্ত বিধিমালার মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে বিধিমালাই অগ্রাধিকার পায়।
নতুন এই আদেশ কার্যকর হলে নিয়োগ ও পদোন্নতির প্রতিটি ধাপে মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রতিনিধিদের ওপর নির্ভরতা বাড়বে, যা সিটি করপোরেশনগুলোর স্বায়ত্তশাসন কমানোর পাশাপাশি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা তৈরি করতে পারে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিভাগের নগর উন্নয়ন-১ অধিশাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রবিউল আলম জানান, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুসরণ করেই স্থানীয় সরকার বিভাগ সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে এই প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। তবে কোনো সিটি করপোরেশনের এ নিয়ে কোনো আপত্তি বা বক্তব্য থাকলে তারা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করতে পারে।