মানবদেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ভার বহনকারী সন্ধি হলো হাঁটু, যা ফিমার, টিবিয়া এবং প্যাটেলার সমন্বয়ে গঠিত। যখন কোনো দুর্ঘটনা, উচ্চতা থেকে পতন বা খেলাধুলার মারাত্মক আঘাতে এই সন্ধি বা এর আশপাশের অংশ ভেঙে যায়, তখন তাকে হাঁটুর জটিল ফ্র্যাকচার বলা হয়। সাধারণ ফ্র্যাকচারের মতো এগুলো কেবল সরল রেখায় ভাঙে না, বরং হাড়গুলো টুকরো টুকরো হয়ে সন্ধির ভেতরের মসৃণ আর্টিকুলার কার্টিলেজকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করালে এটি অস্টিওআর্থ্রাইটিস বা হাঁটু ক্ষয়ের মতো দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার কারণ হতে পারে এবং রোগীর চলাফেরার ক্ষমতা চিরতরে হারানোর ঝুঁকি তৈরি করে।
ট্রমা ম্যানেজমেন্টের প্রথম ধাপ হলো দ্রুত এবং সঠিক রোগ নির্ণয়। শারীরিক পরীক্ষার পাশাপাশি এক্স-রে এবং থ্রি-ডি সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে ফ্র্যাকচারের মাত্রা ও হাড়ের টুকরোগুলোর অবস্থান নিশ্চিত করা হয়। জটিল এসব ক্ষেত্রে কেবল কাস্ট বা প্লাস্টার সবসময় কার্যকর হয় না। আধুনিক অর্থোপেডিক সার্জারিতে অ্যানাটমিক্যাল প্লেট, বিশেষ স্ক্রু এবং এক্সটার্নাল ফিক্সটরের মাধ্যমে হাড়গুলোকে নিখুঁতভাবে জোড়া লাগানো হয়, যাকে ওপেন রিডাকশন অ্যান্ড ইন্টারনাল ফিক্সেশন বা ওরিফ বলা হয়। এর মূল লক্ষ্য হলো হাড়ের স্বাভাবিক আকৃতি ও জোড়ার মসৃণতা ফিরিয়ে আনা, যাতে রোগী ভবিষ্যতে স্বাভাবিকভাবে পা ভাঁজ করতে এবং হাঁটতে পারেন।
সফল অস্ত্রোপচারই শেষ কথা নয়; ট্রমা ম্যানেজমেন্টের একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে সুপরিকল্পিত পুনর্বাসন। অস্ত্রোপচারের পরপরই ফিজিক্যাল থেরাপির মাধ্যমে হাঁটুর নাড়াচাড়া বা রেঞ্জ অব মোশন শুরু করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে জোড়া শক্ত বা স্টিফ হয়ে না যায়। থেরাপিস্টের নির্দেশনা অনুযায়ী নিয়মিত ব্যায়াম পেশির শক্তি বাড়াতে এবং রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। রোগীর বয়স, শারীরিক অবস্থা এবং আঘাতের প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে সম্পূর্ণ সুস্থ হতে কয়েক মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এই দীর্ঘ যাত্রায় রোগী ও চিকিৎসকের পারস্পরিক ধৈর্য ও সহযোগিতা অপরিহার্য।
দুর্ঘটনা এড়াতে ট্রাফিক আইন মেনে চলা এবং কর্মক্ষেত্রে ও খেলাধুলায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার করা বাঞ্ছনীয়। দুর্ভাগ্যবশত এমন জটিল আঘাত পেলে দেরি না করে দ্রুত অভিজ্ঞ অর্থোপেডিক ট্রমা সার্জনের পরামর্শ নিতে হবে। আধুনিক সার্জিক্যাল পদ্ধতি, সময়মতো সঠিক চিকিৎসা এবং নিয়মতান্ত্রিক ফিজিওথেরাপির মাধ্যমেই কেবল একজন মানুষ তার হাঁটুতে পূর্ণাঙ্গ কর্মক্ষমতা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরে পেতে পারেন।